×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

কারখানা বন্ধ থেকে পুনরায় চালু, ঋণ পুনর্গঠন ও নগদ প্রবাহের চাপে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইল

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১২:০৬:১৯
কারখানা বন্ধ থেকে পুনরায় চালু, ঋণ পুনর্গঠন ও নগদ প্রবাহের চাপে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইল

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে মুনাফার ধারাবাহিকতা থাকলেও নগদ প্রবাহে বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা গেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়েছে। তবে তৃতীয় প্রান্তিকে একক প্রান্তিকের ইপিএস সামান্য কমেছে। সব মিলিয়ে জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ৮ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪ টাকা ৭ পয়সার চেয়ে মাত্র ১ পয়সা বেশি।

অন্যদিকে, একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সায় নেমেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ইতিবাচক ৯ টাকা ২১ পয়সা। ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া, সরবরাহকারীদের পরিশোধ বৃদ্ধি এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তরের বিষয়টি নগদ প্রবাহের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে কোম্পানি জানিয়েছে।

এ অবস্থায় ২০২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল এবং ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরে কোম্পানিটি মোট ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১২ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ছিল। এবারও একই হারে ডিভিডেন্ড দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে পূর্ণ অর্থবছরের আয়, নগদ প্রবাহ, আর্থিক অবস্থান এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর।

প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস ও নগদ প্রবাহ—দুটিতেই উন্নতি

তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৯০ পয়সা। আগের ২০২৪ সালের একই সময়ে আয় ছিল ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ইপিএস বেড়েছে ২ পয়সা বা প্রায় ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।

প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহও ইতিবাচক ছিল। এ সময়ে তা দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৬৬ পয়সায়, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩ টাকা ৫৭ পয়সার তুলনায় ৯ পয়সা বেশি। অর্থাৎ, আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থ আসার ক্ষেত্রেও সামান্য উন্নতি হয়েছিল।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ছিল ১০৩ টাকা ৭১ পয়সা। আগের অর্থবছরের ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে এই মূল্য ছিল ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা।

প্রথম প্রান্তিকের তথ্য থেকে বোঝা যায়, আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির আয় ও পরিচালন নগদ প্রবাহ—দুই সূচকেই সীমিত উন্নতি হয়েছিল। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বিক্রি, উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন মুনাফা বা অন্যান্য আয়ের পৃথক পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। তাই ইপিএস বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে কোনো একটি বিষয়কে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

দ্বিতীয় প্রান্তিকেও আয় বেড়েছে, তবে প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্য

২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৯১ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে এই আয় ছিল ১ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে একক প্রান্তিকে ইপিএস বেড়েছে ১ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ।

প্রথম ছয় মাসের সম্মিলিত হিসাবেও প্রবৃদ্ধি বজায় ছিল। জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৮১ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ টাকা ৭৮ পয়সার তুলনায় ৩ পয়সা বেশি। শতকরা হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ দশমিক ০৮ শতাংশ।

তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনে নগদ প্রবাহের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৬৮ টাকা ১৯ পয়সা হয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে তা ইতিবাচক ৩ টাকা ৯০ পয়সা ছিল।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমেছে এবং সরবরাহকারীদের বিপরীতে পরিশোধ বেড়েছে। পাশাপাশি ঋণপত্রের (এলসি) দায়ের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তর করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট নগদ প্রবাহ পরিচালন কার্যক্রম থেকে অর্থায়ন কার্যক্রমে স্থানান্তরিত হয়েছে। এসব পরিবর্তনের কারণে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অর্থাৎ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয় সামান্য বাড়লেও নগদ প্রবাহে বড় ধরনের অবনতি হয়েছিল। এ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হিসাব অনুযায়ী মুনাফা অর্জন করলেও ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সরবরাহকারীদের পরিশোধের সময়সূচির কারণে প্রতিষ্ঠানের হাতে নগদ অর্থের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস কমল কেন?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ সময়ে তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৫৩ পয়সা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে পুনর্বিবেচিত হিসাবে ইপিএস ছিল ১ টাকা ৫৪ পয়সা। ফলে একক প্রান্তিকে আয় কমেছে ১ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।

প্রথম দুই প্রান্তিকে আয় বাড়ার পর তৃতীয় প্রান্তিকে এই সামান্য পতন কোম্পানিটির মুনাফা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় কিছুটা ছন্দপতন নির্দেশ করে। তবে একক প্রান্তিকে মাত্র ১ পয়সা কমে যাওয়াকে বড় ধরনের মুনাফা সংকটের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস কমার নির্দিষ্ট কারণ কোম্পানির দেওয়া আর্থিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিক্রয় কমে যাওয়া, পরিচালন মুনাফার পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো খাতের প্রভাব সম্পর্কে পৃথক তথ্য না থাকায় এর নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, নয় মাসের সম্মিলিত হিসাবে কোম্পানিটির ইপিএস আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৪ টাকা ৮ পয়সা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ের পুনর্বিবেচিত ইপিএস ছিল ৪ টাকা ৭ পয়সা। অর্থাৎ, নয় মাসে আয় বেড়েছে মাত্র ১ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।

এতে দেখা যায়, প্রথম দুই প্রান্তিকের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা গেলেও তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। তৃতীয় প্রান্তিকের সামান্য পতনের পরও নয় মাসের মোট আয় আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি রয়েছে।

নগদ প্রবাহের বড় ঘাটতি কেন উদ্বেগের বিষয়?

তামিজটেক্সের আর্থিক অবস্থান মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহের পরিবর্তন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এই সূচক ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে পুনর্বিবেচিত হিসাবে তা ইতিবাচক ৯ টাকা ২১ পয়সা ছিল।

কোম্পানির ব্যাখ্যায়, স্বল্পমেয়াদি ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তর করায় নগদ প্রবাহের বিভিন্ন খাতে সমন্বয় হয়েছে। অর্থায়ন কার্যক্রমের অধীনে সংশ্লিষ্ট নগদ বহিঃপ্রবাহের হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে, যা আলোচ্য সময়ে সামগ্রিক নগদ প্রবাহের অবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

প্রথমত, ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং সরবরাহকারীদের পরিশোধ বেড়ে যাওয়া পরিচালন নগদ প্রবাহের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বা হিসাবভিত্তিক আয় থাকলেও সেই অর্থ সময়মতো নগদে আদায় না হলে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে চাপ তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, স্বল্পমেয়াদি ঋণ দীর্ঘমেয়াদি দায়ে রূপান্তর করা ঋণ পরিশোধের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে তাৎক্ষণিক দায়ের চাপ কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হওয়ার সুযোগ থাকলেও মোট ঋণের পরিমাণ কমেছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু ঋণের মেয়াদ পরিবর্তনের তথ্য থেকে নেওয়া যায় না।

তবে ঋণ পুনর্গঠনকে একমাত্র কারণ ধরে নগদ প্রবাহের পুরো অবনতি ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। কোম্পানি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমা এবং সরবরাহকারীদের পরিশোধ বৃদ্ধির কথাও জানিয়েছে। তাই পূর্ণ অর্থবছরের নগদ প্রবাহ, পাওনা আদায় এবং দায়ের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

নিট সম্পদমূল্যে কী চিত্র পাওয়া যাচ্ছে?

তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের তথ্যেও সময়ভেদে পরিবর্তন দেখা যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এনএভি ছিল ১০৩ টাকা ৭১ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ টাকা ৭২ পয়সায়।

তবে তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনে ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দেখানো হয়েছে ৯৮ টাকা ৫৭ পয়সা। একই প্রতিবেদনে ৩০ জুন ২০২৫ তারিখের তুলনামূলক এনএভি পুনর্বিবেচিত হিসাবে ৯৩ টাকা ৪৪ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই পুনর্বিবেচিত ভিত্তির তুলনায় ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে এনএভি ৫ টাকা ১৩ পয়সা বেশি। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনে ৩০ জুন ২০২৫ তারিখের এনএভি ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা দেখানো হয়েছিল। দুই প্রতিবেদনে ভিত্তিমূল্যের এই পার্থক্য থাকায় তুলনার ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচিত হিসাব ব্যবহার করা জরুরি।

সামগ্রিকভাবে, পুনর্বিবেচিত ভিত্তিতে নয় মাস শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য আগের অর্থবছরের সমাপ্তির তুলনায় বেশি থাকলেও ডিসেম্বরের ১০৫ টাকা ৭২ পয়সা থেকে মার্চে ৯৮ টাকা ৫৭ পয়সায় নেমেছে। ফলে শুধু এনএভির একটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার পূর্ণ মূল্যায়ন করা যাবে না। সম্পদ, দায়, পুনর্মূল্যায়ন এবং অন্যান্য হিসাবের বিস্তারিত তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

কারখানা সাময়িক বন্ধ, পরে উৎপাদন কার্যক্রম চালুতমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের আর্থিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখের অনুসন্ধানী চিঠির জবাবে কোম্পানি জানায়, ১৫ জুলাই ফেসবুকে কারখানা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকার বিষয়ে একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়েছিল।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুসারে ১৩ জুলাই ২০২৬ থেকে কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ১৮ জুলাই ২০২৬ থেকে কারখানার কার্যক্রম আবার চালু করা হয়। তবে সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ থাকার কারণে আর্থিক হিসাবে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা তখনো মূল্যায়নাধীন ছিল বলে কোম্পানি জানিয়েছে।

এই ঘটনা উৎপাদন ও বিক্রির ধারাবাহিকতা, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কারখানা বন্ধ থাকার ফলে কতটা উৎপাদন কমেছে, কতটা বিক্রি বা মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা পুরো বছরের আর্থিক ফলাফলে এর নির্দিষ্ট প্রভাব কত হবে—সে বিষয়ে কোম্পানি কোনো পরিমাণগত তথ্য দেয়নি।

এ কারণে কারখানা বন্ধের ঘটনাকে তৃতীয় প্রান্তিকে ইপিএস কমার নিশ্চিত কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। কারণ ঘটনাটি ঘটেছে জুলাই ২০২৬-এ, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সমাপ্তির পর। এর আর্থিক প্রভাব মূল্যায়নের বিষয়টি কোম্পানির ঘোষণায় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্রেডিট রেটিংয়ে ‘এ প্লাস’, স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’

তামিজটেক্সকে ওয়াসো ক্রেডিট রেটিং কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড দীর্ঘমেয়াদে ‘এ প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ রেটিং দিয়েছে। রেটিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল বা ‘স্টেবল’।

কোম্পানির ২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ৩০ জুন ২০২৪ তারিখের হিসাব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক গুণগত ও পরিমাণগত তথ্যের ভিত্তিতে এই রেটিং দেওয়া হয়েছে।

রেটিংয়ের এই অবস্থান কোম্পানিটির ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ও সামগ্রিক ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে একটি ইতিবাচক তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে রেটিংটি ২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে দেওয়া হওয়ায় একে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বর্তমান নগদ প্রবাহের দুর্বলতার সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত নয়।

বিশেষ করে, নয় মাসে ঋণাত্মক পরিচালন নগদ প্রবাহ এবং ঋণের মেয়াদ পুনর্গঠনের তথ্য বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন। পুরোনো ভিত্তির রেটিং একাই ভবিষ্যতের ডিভিডেন্ড বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না।

২০২৬ অর্থবছরে ডিভিডেন্ড বাড়বে, নাকি কমবে?

তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের ডিভিডেন্ড সম্ভাবনা মূল্যায়নে গত অর্থবছরের ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক ভিত্তি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ মোট ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ক্যাশ এবং ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ছিল।

প্রতি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের অর্থ ছিল ১ টাকা ২০ পয়সা। এই ক্যাশ ডিভিডেন্ড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল; স্পন্সর ও পরিচালকরা এর আওতাভুক্ত ছিলেন না।

২০২৬ অর্থবছরে ডিভিডেন্ডের হার বাড়বে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ কোম্পানিটির পূর্ণ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল এখনো ঘোষিত হয়নি। ডিএসইকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৫টায় পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে।

ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

১. নয় মাসের ইপিএস ইতিবাচক, তবে প্রবৃদ্ধি খুবই সীমিত

প্রথম নয় মাসে ইপিএস ৪ টাকা ৮ পয়সা, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১ পয়সা বেশি। এই আয় কোম্পানিটির মুনাফা ধরে রাখার ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রবৃদ্ধি এতটাই সীমিত যে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে ডিভিডেন্ড বাড়ার সম্ভাবনা জোরালো বলা যায় না।

২. নগদ প্রবাহের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ

নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ৮৯ পয়সা। নগদ ডিভিডেন্ড দিতে সাধারণত পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ও তারল্য প্রয়োজন। ফলে পূর্ণ অর্থবছরে নগদ প্রবাহের উন্নতি না হলে বেশি নগদ ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে নগদ প্রবাহের এই সংখ্যাকে সরাসরি নগদ অর্থের ঘাটতির সমান ধরে নেওয়া যাবে না; ঋণ পুনর্গঠন ও নগদ প্রবাহের শ্রেণিবিন্যাসও এখানে প্রভাব ফেলেছে।

৩. গত বছরের ডিভিডেন্ড ধরে রাখতে হলে পূর্ণ বছরের ফল গুরুত্বপূর্ণ

আগের অর্থবছরে ১২ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করা হয়েছিল। এবারও একই হার বজায় রাখতে হলে কোম্পানির পূর্ণ বছরের আয়, আর্থিক সক্ষমতা, নগদ অর্থের অবস্থান এবং পর্ষদের বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। নয় মাসের সামান্য ইপিএস প্রবৃদ্ধি একা এই হার ধরে রাখার নিশ্চয়তা দেয় না।

৪. ক্রেডিট রেটিং ইতিবাচক হলেও তা ডিভিডেন্ডের নিশ্চয়তা নয়

দীর্ঘমেয়াদে ‘এ প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ রেটিং কোম্পানির ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে ইতিবাচক তথ্য। কিন্তু রেটিংটি ২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তাই এটি দিয়ে ২০২৬ অর্থবছরে ডিভিডেন্ড বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিযুক্ত নয়।

৫. কারখানার কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া ইতিবাচক, তবে আর্থিক প্রভাব অজানা

জুলাইয়ে সাময়িক বন্ধের পর কারখানা পুনরায় চালু হয়েছে। এটি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ফিরে পাওয়ার ইতিবাচক দিক। তবে বন্ধ থাকার আর্থিক প্রভাব তখনো মূল্যায়নাধীন ছিল। উৎপাদন, বিক্রি, ব্যয় ও নগদ প্রবাহের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব না জানা পর্যন্ত ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা নির্ধারণে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের নজর এখন ২৭ অক্টোবরের বোর্ড সভায়

তমিজ উদ্দিন টেক্সটাইলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের ফলাফল থেকে দেখা যায়, কোম্পানিটি সামান্য হলেও ইপিএস প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। প্রথম দুই প্রান্তিকে আয় বেড়েছে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে কমেছে মাত্র ১ পয়সা। ফলে নয় মাসের সম্মিলিত আয় আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি রয়েছে।

তবে আয় বৃদ্ধির বিপরীতে পরিচালন নগদ প্রবাহের বড় অবনতি, ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া, সরবরাহকারীদের পরিশোধ বৃদ্ধি এবং ঋণের মেয়াদ পুনর্গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। পাশাপাশি জুলাইয়ে কারখানা সাময়িক বন্ধ থাকার আর্থিক প্রভাবও কোম্পানির মূল্যায়নাধীন ছিল।

সব দিক বিবেচনায় ২০২৬ অর্থবছরে তামিজটেক্সের ডিভিডেন্ড বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। একইভাবে ডিভিডেন্ড কমবেই, এমন সিদ্ধান্তও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে গত বছরের ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ড ধরে রাখা বা বাড়ানোর সম্ভাবনা অনিশ্চিত; নগদ প্রবাহের দুর্বলতা বিশেষ করে নগদ ডিভিডেন্ড বৃদ্ধির পথে বড় বিবেচ্য বিষয়।

আগামী ২৭ অক্টোবরের বোর্ড সভায় নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর পূর্ণ বছরের ইপিএস, নগদ প্রবাহ, নিট সম্পদমূল্য এবং পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই ডিভিডেন্ডের সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে