×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সচিবালয়ে কে কখন আসছেন, নিজেই দেখছেন প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১১:৪২:০৮
সচিবালয়ে কে কখন আসছেন, নিজেই দেখছেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানো এবং জনসেবার মান বাড়াতে নজরদারি জোরদার করেছে সরকার। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরাসরি খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কে কখন অফিসে প্রবেশ করছেন, কখন কর্মস্থল ত্যাগ করছেন—ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব তথ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের ৪৩টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থাপনা করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থাটি কীভাবে পরিচালিত হয়, তা জানতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাজিরা ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। সেখানে প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও ডিজিটাল হাজিরা দেন। তিনি হাজিরা ব্যবস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার প্রবেশাধিকার মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও আইসিটি বিভাগের সচিবের কাছে রয়েছে। তাঁরা চাইলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কখন অফিসে আসছেন এবং কখন বের হচ্ছেন, সে তথ্য দেখতে পারবেন।

সরকারি অফিসে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই মাঠপর্যায়ে তদারকিতে নেমেছেন। চলতি বছরের ২৯ মার্চ সকালে তিনি সচিবালয়ে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর আকস্মিক পরিদর্শন করেন। সকাল ৯টার কিছু পর সচিবালয়ে পৌঁছে হেঁটে বিভিন্ন ভবনে যান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির বিষয়ে খোঁজ নেন।

পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কক্ষে গিয়ে তাঁদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। অফিস শুরুর সময় থেকেই কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে সরকারের অবস্থান এ পরিদর্শনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।

দাপ্তরিক কাজের গতি বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং অফিসের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি যাচাইয়ের উদ্যোগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

শুধু ডিজিটাল হাজিরা পর্যবেক্ষণ নয়, সচিবালয়, সরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক পরিদর্শনও করছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এসব পরিদর্শনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, সেবার মান এবং দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনার নানা দিক উঠে আসছে।

সরকারের তদারকি কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে সরকারি হাসপাতালও। সাধারণ মানুষ যাতে যথাসময়ে চিকিৎসাসেবা পান, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।

গত ৭ মার্চ গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এ সময় চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় সামনে আসে। হাসপাতালের ওয়ার্ড ও শৌচাগারের পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাপ্যতা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

এরপর ২৩ মার্চ ঈদুল ফিতরের ছুটির মধ্যে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করাই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

পরদিন, ২৪ মার্চ দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম ভিডিওকলের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের হাজিরা খাতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি। এসব তদারকিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক ও কর্মীদের উপস্থিতি, সেবার মান এবং রোগীদের ভোগান্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

এ ছাড়া ২৬ আগস্ট মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়ম শনাক্ত করার অংশ হিসেবে এসব পরিদর্শন পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি দপ্তরে সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গত ৬ এপ্রিল সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) ঝটিকা পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

পরিদর্শনের সময় নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, অফিস শুরুর নির্ধারিত সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত হতে পারেননি।

প্রতিমন্ত্রী অফিস শুরুর পাঁচ মিনিট আগেই কার্যালয়ে পৌঁছান। তবে তখনও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে আসেননি। সকাল ৯টায় কার্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি দপ্তরে সময়ানুবর্তিতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নৈতিকতা থাকা প্রয়োজন। সরকারি দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা এবং জনসেবার মানসিকতা অপরিহার্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারি দপ্তরে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা জারি করে। এতে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া এবং অফিস শেষে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থল ত্যাগের নিয়ম অনুসরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

নির্দেশনায় সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪ অনুসরণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

এরপরও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরেজমিনে তদারকির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। চলতি বছরের ২ মার্চ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। অফিস শুরুর সময় থেকেই দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এসব নির্দেশনার লক্ষ্য।

সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা পর্যবেক্ষণ এবং মন্ত্রীদের আকস্মিক পরিদর্শনের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার। তাঁর মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা, কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার এবং দায়িত্ব শেষ না করে কর্মস্থল ত্যাগ না করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সময়মতো অফিসে উপস্থিতি এবং কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, সময়মতো অফিসে না আসা কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগে চলে যাওয়া দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নৈতিকতার ঘাটতি নির্দেশ করে। সময়ানুবর্তিতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর চর্চা বাড়লে প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও উন্নতি সম্ভব।

প্রশাসনের সর্বস্তরে নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রমের খোঁজ রাখা। তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, এরশাদের শাসনামলে আকস্মিকভাবে সচিবালয়ের গেটে গিয়ে বিলম্বে আসা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি যাচাই করার ঘটনাও ঘটত।

তবে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে প্রথমে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা এবং নিয়ম মানার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এতে কাজ না হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দেন সাবেক এই সচিব।

সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা পর্যবেক্ষণ, আকস্মিক পরিদর্শন এবং নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতির নির্দেশনার মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর সরকারি কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে