×
ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংক নির্ভরতায় থমকে দেশের শেয়ারবাজার: উত্তরণের উপায় কী?

২০২৬ অক্টোবর ০৩ ২০:১৯:৫৯
ব্যাংক নির্ভরতায় থমকে দেশের শেয়ারবাজার: উত্তরণের উপায় কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতির কলেবর প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে এগোতে পারেনি দেশের শেয়ারবাজার। ২০১০ সালের ভয়াবহ ধসের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিকতা ও গতি ফিরে পায়নি শেয়ারবাজার। প্রায় আড়াই বছর ধরে নতুন কোনো কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে না আসায় বাজারে মানসম্মত শেয়ারের চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর অন্যদিকে দৈনিক লেনদেন তলানিতে নামায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য হারিয়ে মারাত্মক অস্তিত্বসংকটে পড়েছে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো।

বাজারের এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতের অর্থায়নে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের শিল্পখাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ৯৭,১৩৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হলেও শেয়ারবাজার থেকে এসেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা—যা মোট শিল্প অর্থায়নের মাত্র ০.৩১ শতাংশ। অথচ আগের বছরগুলোতেও এই চিত্র বেশ হতাশাজনক ছিল; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শেয়ারবাজার থেকে অর্থায়নের হার ছিল ০.৭৬ শতাংশ (৬৭৯ কোটি টাকা), ২০২২-২৩ অর্থবছরে ০.৬৭ শতাংশ (৬৪১ কোটি টাকা) এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ০.৯৪ শতাংশ (৬৮৫ কোটি টাকা)। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক থেকে সহজে দীর্ঘমেয়াদি মেগা ঋণ পাওয়ার সুবিধার কারণেই উদ্যোক্তারা শেয়ারবাজারের মুখ মুখাপেক্ষী হচ্ছেন না, যা পরবর্তীতে ব্যাংক খতের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্প অর্থায়নে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের সমন্বিত অনুপাত নির্ধারণের জোর দাবি উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সুমিত পোদ্দার প্রস্তাব করেন, নতুন প্রকল্প বা সম্প্রসারণে ৬০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ এবং ৪০ শতাংশ শেয়ারবাজার থেকে সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা জারি করা যেতে পারে। কারণ বর্তমান অর্থসংকটে একা ব্যাংকিং খাতের পক্ষে শিল্পায়নের সার্বিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।

শেয়ারবাজারের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপের চিত্রেও মন্দার স্পষ্ট প্রভাব ফুটে উঠেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গত এক বছরের ২৪৮টি লেনদেন দিবসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৭৬,৬০২ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যেখানে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা। অথচ বাজারমধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার জন্য দৈনিক অন্তত ২,০০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকার লেনদেন আবশ্যক। গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল চলতি বছরের ১২ জুলাই (১,৬৬৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা) এবং সর্বনিম্ন লেনদেন হয় ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বরে (২৬৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা)। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৬৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা এক বছর পর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কিছুটা বেড়ে ৭৫৬ কোটি৩১ লাখ টাকা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

লেনদেনের এই ধসের কারণে চরম সংকটে পড়েছে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। জানা গেছে, বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লেনদেনই হাতে গোনা কয়েকটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত থাকায় ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো টিকতে পারছে না। ডিএসই টাওয়ারের নিকুঞ্জ কার্যালয়ে আগে যেখানে ১২০টি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল, তা বর্তমানে কমে ৬৫টিতে নেমে এসেছে এবং মতিঝিলের পুরোনো ডিএসই ভবনের প্রায় ৩০ শতাংশ স্পেস এখন ফাঁকা। এক শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার ৫ হাজার বর্গফুটের অফিস ছোট করতে হয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৫২ থেকে কমিয়ে ২৫ জনে আনতে হয়েছে। রিজার্ভের প্রায় ১০ কোটি টাকা দিয়ে বেতন দেওয়ার পর সঞ্চয় শেষ হওয়ায় বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিতে হয়েছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, মধ্যস্থতাকারীদের টিকিয়ে রাখতে দৈনিক লেনদেন ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পাশাপাশি প্রতি বছর মানসম্মত ১০-১২টি নতুন আইপিও আনা প্রয়োজন।

এদিকে, আড়াই বছর ধরে নতুন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন না পাওয়া বাজারে মন্দা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএসইসি সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ 'টেকনো ড্রাগস লিমিটেড'-এর আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল। এরপর চলতি বছর এসএমই প্ল্যাটফর্মের একটি কিউআইও (QIO) ব্যতীত সাধারণ আইপিও বন্ধই রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ব্যাংকে আবেদন করলে ৩ সপ্তাহ থেকে ৩ মাসের মধ্যে ঋণ মেলে, অথচ আইপিও প্রক্রিয়ার পেছনে অন্তত ১৫ মাস সময় পার হয়ে যায়। আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া ৩-৪ মাসের মধ্যে নামিয়ে আনা না গেলে উদ্যোক্তারা বাজারে আসতে উৎসাহিত হবেন না।

তবে দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা ও আইপিও খরা কাটাতে এবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি আইপিও নীতিমালায় নমনীয়তা আনা এবং সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিএসইসি ইতোমধ্যে ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ’ বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে। বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম জানান, সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি বাজারে আনতে কাজ চলছে এবং পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের পাশাপাশি বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র‌্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র‌্যানকন মোটরবাইক ও ফাইবার অ্যাট হোমসহ বেশ কিছু বড় কোম্পানি বাজারে আসার আগ্রহ দেখিয়েছে।

সার্বিক বিচারে সুশাসনের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণমূলক দুর্বলতাই এই বাজারের মূল বাধা। আইসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের ধসের পর থেকে এটি এক প্রকার অকার্যকর বা 'নন-ফাংশনাল' বাজারে পরিণত হয়েছে। তার মতে, বাজারে ভালো শেয়ারের অভাব ও দুর্বল মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থার পাশাপাশি মার্জিন ঋণ ও ঋণাত্মক ইক্যুইটির প্রভিশন ঘাটতি বাজারকে আরও টেনে ধরছে। তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত স্টকব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯,৩৬৭ কোটি টাকা। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রশাসনের নেওয়া সংস্কারমূলক উদ্যোগ ও প্রস্তাবিত সরাসরি তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও সফলভাবে কার্যকর হয়—তার ওপরই নির্ভর করছে শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ ঘুরে দাঁড়ানো।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে