×
ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৮ বছরেই উচ্চতর গ্রেড! নবম পে-স্কেলের নতুন নিয়ম জানুন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ১০:৪৪:৫৮
৮ বছরেই উচ্চতর গ্রেড! নবম পে-স্কেলের নতুন নিয়ম জানুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জারি হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল। নতুন এই বেতন কাঠামোতে মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াত, মোবাইল ফোন, হাওর-চর ও পাহাড়ি ভাতার হার বাড়ানো হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য বিশেষ ভাতার বিধানও রাখা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো পদোন্নতি ছাড়াই উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ কমে আসা। কোনো সরকারি চাকরিজীবী একই গ্রেডে আট বছর দায়িত্ব পালন করলেও যদি পদোন্নতি না পান, তাহলে সন্তোষজনক সার্ভিস রেকর্ড থাকা সাপেক্ষে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বর্তমানে এই সুবিধার জন্য একই গ্রেডে ১০ বছর থাকার বিধান রয়েছে।

গত শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয় ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ শিরোনামে নবম বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ২০টি গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা নির্ধারিত বেতন রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন স্কেলে গ্রেডভেদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।

তবে সব সরকারি কর্মচারী ও শ্রমিক নবম পে স্কেলের আওতায় আসছেন না। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস, প্রতিরক্ষা সার্ভিস, পুলিশ বাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নিয়োজিত কর্মচারীরা এই স্কেলের বাইরে থাকবেন। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, শিক্ষানবিশ বা প্রশিক্ষণার্থী, আউটসোর্সিং কর্মী, দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক, চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন কর্মীরাও নতুন বেতন কাঠামোর সরাসরি সুবিধা পাবেন না। তাদের জন্য পরবর্তী সময়ে আলাদা স্কেল বা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।

ভাতার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। চিকিৎসা ভাতা মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিজীবীদের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মাসিক ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে সব ভাতা বাড়েনি। বাংলা নববর্ষ ভাতা আগের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা মাসিক ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় একই গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে।

নতুন করে মোবাইল ফোন ভাতার বিধানও রাখা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১৫০ টাকা মোবাইল ফোন ভাতা পাবেন। পাশাপাশি হাওর বা চর এলাকায় দায়িত্ব পালনকারীদের সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। পার্বত্য জেলার জেলা সদর ও সদর উপজেলায় মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য উপজেলায় একই হারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক পাহাড়ি ভাতা দেওয়া হবে। কোনো চাকরিজীবীর সন্তান প্রতিবন্ধী হলে মাসে ৩ হাজার টাকা বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে। এই সুবিধা সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন সরকারি সেবায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট পদের কর্মীদের জন্য আগের স্মারক অনুযায়ী ঝুঁকি ভাতা ও বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। এসআরবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, দুদক ও কারাগারের মতো সংস্থায় কর্মরত নির্দিষ্ট পদের কর্মীরা এ সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে এনএসআই, ডিজিএফআই, এসএসএফ ও পিজিআরসহ বিশেষ সংস্থায় নিয়োজিত কর্মীদের বিদ্যমান ভাতার ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০ থেকে ১৬তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৬৫ শতাংশ। ১৫ থেকে ১০ম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে, আগে ছিল ৫৫ শতাংশ। ৯ থেকে ৫ম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ এবং ৪ থেকে ১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ রাখা হয়েছে।

খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকায় বাড়ি ভাড়ার হারও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ২০ থেকে ১৬তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ১৫ থেকে ১০ম গ্রেডে ৪০ শতাংশ, ৯ থেকে ৫ম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ এবং ৪ থেকে ১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৩০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে।

অন্যান্য এলাকার জন্য ২০ থেকে ১৬তম গ্রেডে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ, ১৫ থেকে ১০ম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ, ৯ থেকে ৫ম গ্রেডে ৩০ শতাংশ এবং ৪ থেকে ১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ধাপে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে সুবিধা পাবেন। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৭০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডে ৭৫ শতাংশ হারে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর শতভাগ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ১ জুলাই থেকেই কাঠামো কার্যকর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া বেতনও পাবেন।

২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কাঠামোর অন্যান্য সব ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও নতুন কাঠামো অনুযায়ী সুবিধা পাবেন।

নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ২০টি গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধি। গ্রেড-১ এ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার, গ্রেড-২ এ ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার, গ্রেড-৩ এ ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার এবং গ্রেড-৪ এ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।

গ্রেড-৫ এ প্রারম্ভিক বেতন ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার, গ্রেড-৬ এ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার, গ্রেড-৭ এ ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, গ্রেড-৮ এ ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার এবং গ্রেড-৯ এ ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড-১০ এ ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রেড-১১ এ ১২ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ২৫ হাজার, গ্রেড-১২ এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০, গ্রেড-১৩ এ ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার, গ্রেড-১৪ এ ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ এবং গ্রেড-১৫ এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে।

গ্রেড-১৬ এ প্রারম্ভিক বেতন ৯ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৯০০, গ্রেড-১৭ এ ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০, গ্রেড-১৮ এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার, গ্রেড-১৯ এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ এবং সর্বশেষ গ্রেড-২০ এ ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে