×
ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একসঙ্গে বদলাচ্ছে ৭ নিয়ম

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ১৮:১০:৩৩
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একসঙ্গে বদলাচ্ছে ৭ নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের আলোচনা ও নানা প্রক্রিয়া শেষে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, খসড়াটির ভেটিং প্রক্রিয়ার অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির আগে এর ভাষা, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং কোনো ধরনের আইনি অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ানোর বিষয়টিই থাকছে না; বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা, মোবাইল ভাতা এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমাতেও পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে একজন চাকরিজীবীর মোট আয় কতটা বাড়বে, তা শুধু মূল বেতন দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না।

নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে মূল বেতন বৃদ্ধি। প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী, নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হতে পারে। দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা এবং দ্বাদশ গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার তথ্যও এসেছে। অর্থাৎ অনেক গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার কথা বলা হলেও এটি একবারে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমান কাঠামোয় সব গ্রেডে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা থাকলেও নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে আলাদা হার নির্ধারণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকতে পারে। পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে। ফলে উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমতে পারে।

বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবেও পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত কাঠামোয় এ হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনার তথ্য রয়েছে। ঢাকা সিটির বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকার বাড়িভাড়ার হারেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে শতাংশের হার কমলেও নতুন মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় বাস্তবে বাড়িভাড়া বাবদ পাওয়া টাকার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বাড়তে পারে।

চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাতেও পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য ৩ হাজার টাকা, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের ৪ হাজার, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা চালুর তথ্য এসেছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে এ সুবিধা প্রযোজ্য হতে পারে।

যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতাতেও বাড়ানোর প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন পে-স্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতা চালুর উদ্যোগের তথ্যও সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মাসে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়া হতে পারে।

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ বছরের সময়সীমা কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। এটি কার্যকর হলে দীর্ঘদিন একই গ্রেডে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে আগেই আসতে পারে। তবে কোন পদে, কী শর্তে এবং কীভাবে এই নিয়ম কার্যকর হবে, তা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট হবে।

নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বর্তমানে চালু থাকা ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা বা বিশেষ সুবিধা বাতিল হতে পারে বলেও প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া এ সুবিধা পরবর্তীতে মূল বেতনের ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল। ফলে নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়লেও একজন চাকরিজীবীর হাতে পাওয়া মোট অর্থের হিসাব করতে হলে এই বিশেষ সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ বর্তমান মোট বেতন ও নতুন মোট বেতনের তুলনাই প্রকৃত আর্থিক পরিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই ২০২৬ থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, পরবর্তী ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। দশম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে বাকি ২৫ শতাংশ কার্যকরের তথ্য রয়েছে। নতুন বাড়িভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার পূর্ণাঙ্গ কার্যকর নিয়েও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

ফলে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে আসতে পারে। মূল বেতন বৃদ্ধি, ইনক্রিমেন্টের নতুন হার, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার পরিবর্তন, মোবাইল ভাতা, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা এবং বিশেষ প্রণোদনা বাতিল—সবকিছু মিলিয়েই একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ধারিত হবে। তবে এসব তথ্যের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ও বিস্তারিত শর্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরই নিশ্চিত হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে