×
ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বাস্থ্যসেবা নাকি বড় ব্যবসা; ভারতের চিকিৎসা খাত নিয়ে নতুন বিতর্ক

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ১৭:৪৩:০২
স্বাস্থ্যসেবা নাকি বড় ব্যবসা; ভারতের চিকিৎসা খাত নিয়ে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতে গত কয়েক বছরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি নতুন নতুন শয্যা যুক্ত হচ্ছে এবং ছোট শহরগুলোতেও চিকিৎসাসেবার পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবার অবকাঠামো ও সুযোগ বাড়লেও একই সঙ্গে চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্রের ছোট শহর মিরাজ এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও গত পাঁচ বছরে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের পাশে ৫০টির বেশি মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এ চিত্র ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতাকেও তুলে ধরে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালগুলো দ্রুত নতুন শয্যা যুক্ত করছে এবং ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট শহরেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে। একই সময়ে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে দেশজুড়ে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শুরুতে ভারতের বৃহত্তম মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান মণিপাল হেলথের আইপিও থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়, যা চলতি বছরে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম আইপিও হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভারতের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ খাত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। গ্র্যান্ট থর্নটনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ খাতে প্রায় ৬০০টি একীভবন, অধিগ্রহণ ও প্রাইভেট ইকুইটি লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এর প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ হাসপাতাল খাতে গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত দুই বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।

তবে বিপুল বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের বিপরীতে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একটি সরকারি প্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ প্রায় পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি। ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো গুরুতর রোগের চিকিৎসায় এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি প্যানেল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে ক্লিনিক, নার্সিং হোম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের অসম বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এর ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার মান ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। রোগীদের অতিরিক্ত বিল, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির বাড়তি ব্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থায়ও প্রভাব ফেলছে বলে সরকারি প্যানেলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে কিছু পরিবার ঋণের বোঝায় পড়ছে এবং সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে বলে সেখানে বলা হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ, মূল্য নির্ধারণ এবং রোগীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত আইভি সেটে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার তথ্য পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্য চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি প্যানেল হাসপাতালের কক্ষভাড়া নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষার মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা ঠেকাতে মানসম্মত চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। হাসপাতাল চেইনে ৫১ শতাংশের বেশি বিদেশি মালিকানার বিষয়েও প্যানেল সতর্কতা জানিয়েছে।

তবে বেসরকারি হাসপাতাল খাতের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাবের কিছু অংশের বিরোধিতা করা হয়েছে। ন্যাশনাল হেলথকেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য বিবিসিকে বলেছেন, হাসপাতালের চিকিৎসা ও সেবার মূল্য সরাসরি নির্ধারণের পরিবর্তে কর, জমি, মূলধন, জনবল ও নিয়ন্ত্রক ব্যয়সহ স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত খরচ কমানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসাসেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার চিকিৎসক শ্রীনাথ রেড্ডি বিবিসিকে বলেন, ভারতে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা এখন অনেকাংশে বিক্রেতার নিয়ন্ত্রিত বাজারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চতর চিকিৎসাসেবায় বিদেশি প্রাইভেট ইকুইটির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চিকিৎসার মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে বলেও তিনি মত দিয়েছেন।

ফলে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে উন্নত হাসপাতাল ও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চ ব্যয়ের কারণে এসব সেবা কতটা মানুষের নাগালের মধ্যে থাকছে—এ প্রশ্নই এখন দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম আলোচিত বিষয়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে