×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বর কমে যাওয়ার পরই বড় বিপদ! ডেঙ্গু নিয়ে জরুরি সতর্কতা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৭:১৩:২৬
জ্বর কমে যাওয়ার পরই বড় বিপদ! ডেঙ্গু নিয়ে জরুরি সতর্কতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় ডেঙ্গুকে মূলত বর্ষাকালের রোগ হিসেবেই দেখা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলেছে। বর্ষা শেষ হওয়ার পরও দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত নানা সমস্যা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

এবার ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো—সব রোগীর ক্ষেত্রে পরিচিত উপসর্গগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। অনেকের শুধু জ্বর বা মাথাব্যথার মতো সাধারণ উপসর্গ থাকায় শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন অনেকে।

এর একটি উদাহরণ মুনিয়ার (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ জ্বর ও মাথাব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এর আগে দুইবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় এবারও পরীক্ষা করান। প্রথম দিনেই NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।

তবে এর আগের দুইবারের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। প্রথমবার তার জ্বর ছিল তুলনামূলক কম এবং সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। প্রস্রাব পরীক্ষার একটি ফল দেখে চিকিৎসক প্রথমে ইউরিন ইনফেকশনের সন্দেহ করেন। পরে দীর্ঘদিন দুর্বলতা থাকায় আবার পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। একইভাবে দ্বিতীয়বারও শুধু জ্বরের কারণে ডেঙ্গু সন্দেহ করা হয়নি।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর উপসর্গ সবসময় একই রকম নাও হতে পারে। সাধারণভাবে হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, হাড়-পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, শরীরে লালচে র‍্যাশ, বমিভাব, ক্ষুধামন্দা এবং অতিরিক্ত দুর্বলতা ডেঙ্গুর পরিচিত লক্ষণ।

তবে রোগ জটিল পর্যায়ে গেলে কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র পেটব্যথা বা পেটে স্পর্শকাতরতা, বারবার বমি, বমিতে রক্ত, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ এ সময় কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং শকের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। রক্তক্ষরণসহ অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

এ কারণে জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ডেঙ্গু শনাক্তে NS1 অ্যান্টিজেন, IgM বা অন্যান্য পরীক্ষা দিতে পারেন। রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।

দেশে বছরের প্রথম নয় মাস শেষ হওয়ার আগেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ফলে শিশুদের জ্বর হলে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি বা উপযুক্ত তরল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা যেতে পারে। জ্বর বা ব্যথার জন্য ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খাওয়াই নিরাপদ।

ডেঙ্গু রোগীকে মশারির মধ্যে রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়, যাতে এডিস মশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড় দিয়ে পরে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে না পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফুলের টব, এসির পানি জমার স্থান, পরিত্যক্ত পাত্র বা অন্যান্য জায়গায় জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা জরুরি।

এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারও বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দেশব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার স্থাপন, রোগীর চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করার নির্দেশনাসহ রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য জ্বরকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বাড়ি ও আশপাশে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা—এই দুই পদক্ষেপই সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর



রে