ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬

নেপাল-তিব্বতের দুর্যোগ নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য

২০২৬ আগস্ট ২৮ ১৬:০৫:১৯
নেপাল-তিব্বতের দুর্যোগ নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে হিমালয়ে দ্রুত বরফ গলে যাওয়ার ঝুঁকি আবারও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রথম দিকে ভূমিকম্পের খবর পাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূকম্পনের কারণে ভূমিধসের সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকেই ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এ ঘটনায় অন্তত ৪৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরে জানায়, হিমবাহ ধসে পড়ার কারণেই এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ কোনো একটি হিমবাহ বা এর বড় অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসে।

ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহ উপত্যকার তলদেশে আঘাত করার সময় প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি হয়। সেই অভিঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে জানান, তার দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। এলাকাটি বন্যাকবলিত স্থান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে। হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ার পর পানি ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে পশ্চিম দিকে নিচে নেমে আসে।

আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি)-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, অনেক উঁচু এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বড় ধস নেমে থাকতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশী নদীর একটি শাখা নদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে।

এর ফলে নদীতে হঠাৎ প্রবল পানির স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোত পানি, পলি ও বড় বড় পাথর ভাটির দিকে বয়ে নিয়ে যায়। আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা ৭ থেকে ৯ মিটার বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতে কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মাইক সার্লের মতে, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও সময় নিতে পারে।

তার ধারণা, প্রথমে বড় ধরনের ভূমিধস হয়। এরপর ধ্বংসাবশেষের কারণে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পানি জমতে থাকে। একপর্যায়ে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গিয়ে বিশাল বন্যার সৃষ্টি হয়।

এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত এবং পর্বতের দুই পাশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা। ফলে পানি ও ধ্বংসাবশেষ খুব দ্রুত নিচের দিকে নেমে যেতে পারে।

তবে হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

সার্ল বলেন, লাংটাং লিরুংসহ হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকা দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ভূত্বকীয় প্লেট অন্য একটি প্লেটকে ওপরে ঠেলে দেয়। তিনি বিষয়টিকে গাড়ির নিচে জ্যাক বসিয়ে সেটিকে ওপরে তোলার সঙ্গে তুলনা করেন।

পর্বত যত ওপরে উঠছে, কিছু হিমবাহও তত বেশি খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে বরফের ছোট ছোট অংশ খসে পড়া অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত এসব ঘটনায় তুলনামূলক ছোট বরফখণ্ড নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দিলেও পরে পানির স্রোতে ভেসে যায়।

কিন্তু এবারের ঘটনায় পুরো হিমবাহের একটি বড় অংশ একসঙ্গে ধসে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সার্লের ভাষায়, এটি ‘খুবই অস্বাভাবিক’ ঘটনা।

বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের দুর্যোগে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও থাকতে পারে। একদিকে হিমালয়ের ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতশ্রেণি ওপরে উঠছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং হিমবাহ দ্রুত গলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ ও পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন। পারমাফ্রস্ট হলো দীর্ঘ সময় ধরে জমাট অবস্থায় থাকা মাটি বা ভূস্তর।

চলতি বছরের শুরুতে আইসিআইএমওডির এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো প্রায় দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যা, ভূমিধসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঝুঁকি বাড়ছে।

ড. কুক জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসে বন্যা ও ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটেছে।

২০২১ সালে ভারতের উত্তরাঞ্চলের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়েছিল। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি ভাটির দিকে নেমে আসে এবং প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

এ ধরনের ঘটনায় হিমবাহ ধসের অভিঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বিশ্লেষণও প্রকাশ করেন।

নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বন্যার ঘটনা ঘটেছিল।

আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, পৃথিবীর হিমায়িত অঞ্চল বা ক্রায়োস্ফিয়ারে বিপজ্জনক ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। আগের তুলনায় এসব পরিবর্তন এখন আরও স্পষ্ট এবং দ্রুতগতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

ড. কুকের মতে, ঘটনাগুলোর ধরন জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার ছোট হবে, তুষার গলার হার বাড়বে এবং কিছু পাহাড়ি ঢালকে স্থিতিশীল রাখা পারমাফ্রস্টও উষ্ণ হয়ে গলতে শুরু করবে।

এর ফলে ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানির প্রবাহ এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়ার মতো ঘটনা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে হিমবাহ ধসে পড়ার ঝুঁকিও। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জলবায়ুর উষ্ণতা উচ্চ পার্বত্য এলাকার পরিবেশকে ক্রমেই আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে