ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

ভারতের মতো সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা

২০২৬ জুন ৩০ ১২:২০:৩১
ভারতের মতো সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: পাঁচশ ও এক হাজার টাকার ব্যাংক নোট বাতিলের একটি প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট আগের মতোই বৈধ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যাংক নোট বাতিলের নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও অতীতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে তা ছিল অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, স্বাভাবিক সময়ে নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দাবি করেন, অনেক মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে নগদ অর্থ ঘরে রেখে দিচ্ছেন।

তিনি প্রস্তাব দেন, ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট বাতিল করে পুরোনো নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুই মাস সময় দেওয়া যেতে পারে। তার মতে, এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য বাড়বে এবং অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিভিন্ন কারণে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—কালো টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, জাল নোট নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বড় পরিবর্তনের পর নতুন মুদ্রা চালু করা

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, অনেক সময় কর ফাঁকি দিয়ে জমা হওয়া অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর জাল নোটের বিস্তার ঠেকাতে ১৯৭৩ সালে জলছাপবিহীন কিছু ব্যাংক নোট বাতিল করেছিল তৎকালীন সরকার।বিশেষজ্ঞদের মতে, নোট বাতিলের মাধ্যমে কালো টাকা নিয়ন্ত্রণ বা দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

ড. মাহফুজ কবীর বলেন, যাদের কাছে অবৈধ অর্থ থাকে, তারা বিভিন্ন উপায়ে সেই অর্থ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। ফলে মূল লক্ষ্য অনেক সময় অর্জিত হয় না।

অন্যদিকে ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, হঠাৎ ব্যাংকে বিপুল আমানত এলেও তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব না হলে ব্যাংকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক নোট বাতিলের ফলে কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—সরকার ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়া, ব্যাংকে দীর্ঘ লাইন ও নগদ অর্থের সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক স্থবিরতা, স্বর্ণ ও ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, নতুন নোট ছাপাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত পুরোনো নোট বদলাতে ব্যাংকে ভিড় করেন, যা অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।২০১৬ সালে ভারত সরকার ৫০০ ও ১,০০০ রুপির নোট বাতিল করলে দেশটির প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশ একদিনে অচল হয়ে যায়।

এতে ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘ লাইন, নগদ অর্থের সংকট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। পরে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ নোটই ব্যাংকে ফিরে আসে। ফলে কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে ওই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, ব্যাংক নোট বাতিল সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে