ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট ও তারল্য ঘাটতিতে চাপে এবি ব্যাংক

২০২৬ জুন ০৬ ১৬:২৮:৪৮
প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট ও তারল্য ঘাটতিতে চাপে এবি ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এবি ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের আর্থিক দুর্বলতা, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সংকট এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা পরিপালনে একাধিক ব্যত্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এম এম রহমান অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ ও ‘অদার ম্যাটার’ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন সংক্রান্ত বিষয়ে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৮৮ দশমিক ০৫ শতাংশ পর্যালোচনা করে নিরীক্ষকরা প্রথমে ২৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার শ্রেণিকৃত ঋণ শনাক্ত করেন, যা মোট স্থিতি ঋণের ৭৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিপরীতে ব্যাংক নিজে শ্রেণিকৃত ঋণ দেখিয়েছিল ১৮ হাজার ১৯৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত ১০ হাজার ২৫০ কোটি ৫৩ লাখ টাকার শ্রেণিকৃত ঋণ চিহ্নিত হয়। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৪১৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যেখানে ব্যাংক সংরক্ষণ করেছে মাত্র ২ হাজার ২৯৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ফলে প্রাথমিকভাবে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২০ হাজার ১১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চতুর্পক্ষীয় বৈঠকের পর ব্যাংক অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ জমা দেয়। এসব বিবেচনায় ৪ হাজার ৭৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকার সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশাধীন ঋণ, ডাউন পেমেন্ট এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃক উপস্থাপিত সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে অতিরিক্ত শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কমে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় নেমে আসে। এরপরও মোট শনাক্তকৃত শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন নির্ধারিত হয়েছে ২০ হাজার ৩৫১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যার বিপরীতে ব্যাংক সংরক্ষণ করেছে মাত্র ২ হাজার ২৯৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ফলে চূড়ান্ত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিনাকল গ্লোবাল ফান্ড পিটিই লিমিটেডে বিনিয়োগের বিপরীতে ১৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

সরকারি সিকিউরিটিজের রিপো লেনদেনের কারণে ব্যাংকটির ৩৯৭ কোটি ২১ লাখ টাকার মার্ক-টু-মার্কেট (এমটিএম) লোকসান হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুসরণ না করে এই লোকসান মুনাফা-লোকসান হিসাবে না দেখিয়ে ‘ডিফার্ড এমটিএম লস’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

নন-ব্যাংকিং সম্পদ (এনবিএ) হিসাবেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ৩২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার নন-ব্যাংকিং সম্পদের মধ্যে ৩২ কোটি ২৪ লাখ টাকা এনবিএ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে সম্পত্তির নামজারি ও খাজনা পরিশোধের যথাযথ প্রমাণ না থাকায় এ সম্পদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

এ ছাড়া বেক্সিমকো লিমিটেডের জিরো কুপন বন্ডে ব্যাংকটির ২৭৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। গত ছয় মাসে এ বিনিয়োগ থেকে কোনো সুদ আয় হয়নি। বিপরীতে ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকার সুদ জমা হলেও তা আদায় হয়নি। নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, এই সুদের বিপরীতে কোনো প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়নি, যা ভবিষ্যতে অতিরিক্ত প্রভিশন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ক্যাশলিংক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সাল থেকে কার্যক্রমহীন। প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত লোকসান ১৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। ব্যাংকের ২১ কোটি ৪২ লাখ টাকার বিনিয়োগের বর্তমান নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) মাত্র ৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ফলে ১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার অবচয় ঘাটতি তৈরি হলেও এ বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি।

তারল্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) এবং বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ হার (এসএলআর) বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবি ব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটি গড় চাহিদা ও মেয়াদি দায়ের বিপরীতে নির্ধারিত ১৩ শতাংশ এসএলআরও সংরক্ষণ করতে পারেনি।

মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০২৫ সালের শেষে এবি ব্যাংকের সিআরএআর ছিল ঋণাত্মক ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। নিরীক্ষকদের মতে, এটি ব্যাংকের মূলধনে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

এ ছাড়া সঞ্চিত লোকসানের কারণে ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় একক গ্রাহক বা গ্রুপভিত্তিক ঋণসীমা (সিঙ্গেল বোরোয়ার এক্সপোজার লিমিট) সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও কার্যত পরিপালন করা সম্ভব হয়নি। যদিও ঋণ অনুমোদনের সময় এসব ঋণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল জারি করা একটি বিশেষ ছাড়পত্রের মাধ্যমে ঋণ, বিনিয়োগ, অন্যান্য সম্পদ ও অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে শিথিলতা দিয়েছে। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই ব্যাংক আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করেছে।

তবে এসব গুরুতর পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান তাদের নিরীক্ষা মতামত পরিবর্তন করেনি এবং আর্থিক বিবরণীর ওপর কোনো সংশোধিত মতামত প্রদান করেনি।

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে