ঢাকা, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় বিক্রিতে চাপে শেয়ারবাজার

২০২৬ মে ১৬ ২৩:৫১:৩৯
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় বিক্রিতে চাপে শেয়ারবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এপ্রিল মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক শেয়ার বিক্রি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বড় পরিসরে শেয়ার বিক্রি করেছেন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ১২৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিপরীতে, একই সময়ে তারা কিনেছেন মাত্র ১২ কোটি ৬ লাখ টাকার শেয়ার। ফলে বিদেশিদের লেনদেনে বড় ধরনের নেতিবাচক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ খাতে চলে যাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও।

এপ্রিল মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১৩৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা মার্চ মাসের তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বিক্রির চাপই নয়, বরং বিদেশিদের নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহও স্পষ্ট করছে। এতে বাজারের তারল্যও কমে যাচ্ছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে এমন তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ১৩০টি। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে ১৯টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, বেড়েছে ১৪টিতে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৯৭টি কোম্পানিতে।

সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিক্রি হয়েছে বড় মূলধনি ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোতে। এর মধ্যে স্কয়ার ফার্মা থেকে বিদেশিরা প্রায় ৪০ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফলে কোম্পানিটিতে বিদেশি শেয়ারধারণ কমে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে ১৫ দশমিক ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।

একইভাবে ব্র্যাক ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৩৭ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এতে ব্যাংকটিতে বিদেশি শেয়ারধারণ ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া রেনেটা, বৃটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ এবং গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানিতেও উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়েছে।

কিছু কোম্পানি থেকে বিদেশিরা পুরোপুরি বেরিয়ে গেছেন। এপ্রিল মাসে রিং শাইন টেক্সটাইল ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে থাকা অবশিষ্ট সব শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্সুরেন্সের বিদেশি বিনিয়োগ প্রবেশ করেছে।

বিদেশি ক্রয়ের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল বিএসআরএম স্টিল। কোম্পানিটিতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ফলে তাদের শেয়ারধারণ বেড়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এতে বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দেশের শেয়ারবাজারে ভালো করপোরেট সুশাসনসম্পন্ন ও শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা সীমিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ খুব অল্প কয়েকটি শেয়ারে কেন্দ্রীভূত। ফলে বাজারে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হলে বড় আকারের বিক্রির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া দুর্বল করপোরেট সুশাসন, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি, জাঙ্ক স্টকের আধিক্য, মূলধনি মুনাফার করব্যবস্থার জটিলতা এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়াগত জটিলতাও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগে বাধা হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

ডিএসই কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক বিক্রি দেশের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিদেশিরা যখন সিটি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মতো শীর্ষ কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ কমাচ্ছেন, তখন ডিএসইএক্স সূচকের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে