×
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

মিয়ানমার সীমান্তে নতুন বাস্তবতা: নিরাপত্তা সমীকরণে ঢাকা

২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১১:০৯:৫৪
মিয়ানমার সীমান্তে নতুন বাস্তবতা: নিরাপত্তা সমীকরণে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে ঘটে গেছে এক আমূল পরিবর্তন। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর (তাতমাদাও) নজিরবিহীন পরাজয়ের পর টেকনাফ ও ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে এখন আর নেপিদোর কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং পুরো সীমান্ত ও রাখাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের জাতীয় পতাকার বদলে এখন উড়ছে আরাকান আর্মির নিজস্ব পতাকা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে এক জটিল কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।

একসময়ের অপ্রতিরোধ্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা বাহিনী রাখাইনের মাটিতে এখন রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে। প্রাণভয়ে জান্তা বাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) শত শত সদস্য অস্ত্র ফেলে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মেজর জেনারেল ত্বান ম্রাত নাইংয়ের নেতৃত্বে আরাকান আর্মি এখন আর কেবল গহীন জঙ্গলের কোনো গেরিলা বাহিনী নয়। মংডু, বুচিডং থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা একের পর এক সামরিক ঘাঁটি দখল করে তারা এখন রাখাইনের বিশাল এলাকার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। ফলে ঢাকা এখন এমন এক শক্তির মুখোমুখি, যাকে আন্তর্জাতিক আইনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাষ্ট্র’ বলা যায় না, আবার বাস্তবতার নিরিখে উপেক্ষা করাও অসম্ভব।

সীমান্তের এই পটপরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন মাত্রার আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বয়ে এনেছে:সীমান্তে নাশকতা ও অপহরণ: নাফ নদীতে বাংলাদেশি জেলেদের অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপমুখী ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হচ্ছে এবং সীমান্তের জিরো লাইনে এসে পড়ছে মর্টার শেল। আতঙ্কে সীমান্তের কৃষকরা ধান কাটতে পারছেন না এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

যোগাযোগের সংকট: আগে সীমান্তে কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সরাসরি মিয়ানমারের বিজিপির সাথে ফ্ল্যাগ মিটিং বা হটলাইনে কথা বলে সমাধান করত। কিন্তু বর্তমানে ওপারে সেই লাল টেলিফোনটি ধরার মতো কেউ নেই। নেপিদোর সাথে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না, কারণ সীমান্তের ওপর মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই অবশিষ্ট নেই। ফলে অপহৃত জেলেদের ফেরত আনা বা সীমান্তে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ জানানোর মতো কোনো আনুষ্ঠানিক পক্ষ খুঁজে পাচ্ছে না ঢাকা।

কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার জন্য এক বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কাদের কাছে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে? মিয়ানমারের জান্তা সরকার যেখানে নিজেদের একটি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণই ধরে রাখতে পারছে না, সেখানে তারা কীভাবে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা দিয়ে ফিরিয়ে নেবে? রাখাইনের মাঠের বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ আরাকান আর্মির হাতে।

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে রাখাইনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের সাথে রোহিঙ্গাদের সংঘাতের ইতিহাস থাকলেও, সম্প্রতি আরাকান আর্মি তাদের সুর কিছুটা পাল্টেছে। তারা রাখাইনে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের ঘোষণা দিয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি তাদের কোনো কৌশলগত রাজনৈতিক চাল, নাকি সত্যিই নতুন কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখাইনের স্বপ্ন—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। তবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হলে রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রক আরাকান আর্মির সাথে যে একটি সমীকরণে আসতেই হবে, তা স্পষ্ট।

আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা উচিত কি না, তা নিয়ে ঢাকার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি ভিন্ন মত দেখা যাচ্ছে:

১. প্রথাগত কূটনীতির পক্ষ: প্রবীণ কূটনীতিকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কেবল আরেকটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথেই আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখতে পারে। আরাকান আর্মির মতো একটি ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করলে তা মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নেতিবাচক কূটনৈতিক নজির সৃষ্টি করতে পারে।

২. বাস্তববাদী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পক্ষ: সামরিক ও নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের যুক্তি হলো, মাঠের বাস্তবতা প্রথাগত আইনের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। মাঠে যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তার সাথেই কথা বলতে হবে। কেবল নেপিদোর দিকে তাকিয়ে থাকলে সীমান্তের অস্থিরতা কমবে না এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চিরকালের জন্য ফাইলবন্দী হয়ে থাকবে। তাঁদের মতে, কূটনীতিতে ‘রাষ্ট্র বনাম অরাষ্ট্রীয় শক্তি’র চিরাচরিত বিভাজন ভেঙে ‘প্র্যাগম্যাটিজম’ বা বাস্তববাদী পথে হাঁটা জরুরি।

এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরাশক্তিগুলো ইতিমধ্যেই বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করেছে:

চীনের অবস্থান: মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় মিত্র হওয়া সত্ত্বেও এবং রাখাইনে কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও কুনমিং পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইনের মতো বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও চীন কেবল নেপিদোর ওপর ভরসা করে বসে নেই। নিজের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে বেইজিংয়ের গোয়েন্দারা সন্তর্পণে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

ভারতের কৌশল: রাখাইনের মধ্য দিয়ে ভারতের ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রজেক্ট’ বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে যুক্ত করবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সুরক্ষার স্বার্থে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) ইতিমধ্যেই পর্দার আড়ালে আরাকান আর্মির সাথে আলোচনা শুরু করেছে।

চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলো যদি নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রথাগত নিয়ম শিথিল করে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে সমান্তরাল যোগাযোগ রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশের মতো দেশ—যার স্বার্থ আরও বেশি প্রত্যক্ষ ও অস্তিত্ব রক্ষার শামিল—তারা কেন পিছিয়ে থাকবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথাগত কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো প্রকাশ্যে রাষ্ট্রাচার বজায় রাখলেও, পর্দার আড়ালে গোয়েন্দা ও সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে (‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তা করে) আরাকান আর্মির সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু কার্যকর যোগাযোগ বা ‘ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ’ স্থাপন করা ছাড়া ঢাকার সামনে বিকল্প পথ সীমিত।

জেলেদের নিরাপত্তা, সীমান্তের শান্তি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চাবিকাঠি এখন আরাকান আর্মির হাতে। তবে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কি প্রকাশ্যে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবে, নাকি সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে কেবল গোয়েন্দা পর্যায়ে ‘ব্যাকডোর’ আলোচনা চালিয়ে যাবে—সেটিই এখন ঢাকার নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে