×
ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদের উপর গোয়েন্দাদের চোখ

২০২৬ অক্টোবর ৩০ ২১:৪০:৪৪
পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদের উপর গোয়েন্দাদের চোখ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর পূর্বাচলে একটি প্রজেক্টে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনে সম্প্রতি ডিবি পুলিশের তল্লাশিকে কেন্দ্র করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, পূর্বাচলের ওই আবাসন প্রকল্পে অনেক পুলিশ কর্মকর্তারই একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলো তারা ভাড়াও দিয়েছেন। এছাড়া জমি কেনাবেচা, নিজস্ব বাড়ি-ফ্ল্যাট এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও বিপুল সম্পদের মালিকানা রয়েছে অনেকের। নামিদামি দেশি-বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও বিলাসী জীবনযাত্রার সাথে অফিশিয়াল আয়ের মিল না থাকায় সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের খোঁজে নেমেছে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থা।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার রদবদলের পর পুলিশ কর্তাদের এমন বিপুল ধনসম্পদের হিসাব দেখে তাজ্জব বনে গেছেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা। এসব প্রাথমিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতি দমন কমিশন ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রাক্তন ও বর্তমানে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যদের সম্পদের বিস্তারিত খতিয়ান তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্রের নানাবিধ অনিয়ম নিয়ে দুদক ও গোয়েন্দাদের কাছে নির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের গভীরতা বিবেচনা করে সেসবের যাচাই-বাছাই চলছে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে। পূর্বাচলের বিশেষ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল বাড়ি বানানোর তহবিলের উৎস অনুসন্ধান করছেন তদন্তকারীরা। প্রভাবশালী এই তালিকার মধ্যে সাবেক একাধিক আইজিপিসহ বর্তমানের পদস্থ কর্তারাও রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সার্ভিস রুলস লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নজরদারিতে থাকা পুলিশ সদস্যদের অনেকেরই ঢাকাসহ বিদেশের মাটিতে বিশাল সাম্রাজ্য রয়েছে। তাদের অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সন্তানদের বিদেশের দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পেছনে। ইতোমধ্যেই অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আর এম মনিুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর সম্পদ বিবরণী তলবের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক, যেখানে প্রায় ৩ কোটি টাকার খতিয়ান মিলেছে। অন্যদিকে, প্রায় ৮৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ডিবি পরিদর্শক ফখরুদ্দীন ভূঞা ও তার স্ত্রীর নামে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি ডিবির সাবেক কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় চার্জশিট দাখিল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের অর্থ পাচার মামলার বিচার প্রক্রিয়া, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকের নথিপত্র গায়েব করার চেষ্টা এবং এসআই হুমায়ন কবিরের বিরুদ্ধে নতুন অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বেতনের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য, বেনামে জমি-ফ্ল্যাট ক্রয়, ব্যবসায়ে মূলধন যোগান এবং স্বজনদের নামে সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়গুলো কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো সদস্য অনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন কি না—তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন গোয়েন্দারা। এই বিষেয়ে এক বক্তব্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ঘুষ, দুর্নীতি ও ভয় দেখিয়ে অর্জিত সম্পদের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে কাউকেই হেনস্তা করা হবে না।

সংবেদনশীল মামলা দায়ের, চার্জশিট দেওয়া, গ্রেফতার বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মতো সাধারণ দায়িত্ব পালনের আড়ালেও দুর্নীতির বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে প্রভাবশালী সহকর্মীদের নাম থাকায় এসব তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সূক্ষ্মভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার দাবি দুদকের। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, ঢালাওভাবে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও অনিয়মের তথ্য পেলেই কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ লুকানোর প্রধান উপায় হিসেবে বেনামে সম্পদ কেনাকে চিহ্নিত করেছেন তদন্তকারীরা। দলিলপত্রে অন্য কারও নাম থাকলেও আসল অর্থদাতা কে বা এর সুফল কে ভোগ করছেন, তা উন্মোচনে ব্যাংক নথি, ঋণের কাগজ ও পার্টনারশিপ চুক্তিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের পরিবার ও সন্তানদের বিদেশযাত্রার অঢেল ব্যয়ের খাতও এখন তদন্তের আওতায় এসেছে। অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ এভাবে পরিবারের সদস্যদের নামে পাচার বা নথিভুক্ত করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দাদের দাবি। এক কর্মকর্তার মতে, গুটিকয়েক দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যের অপকর্মের দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর গিয়ে পড়ছে।

গোয়েন্দা ও দুদকের তালিকায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, খন্দকার গোলাম ফারুক, শফিকুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ, পিবিআইয়ের সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন ডজনখানেক ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে আচরণের ১৯৭৯ সালের বিধিমালার ১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি বছর সম্পদের বিবরণী ও তার পরিবর্তনের তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যবাধকতা হলেও এটি মানার ক্ষেত্রে তীব্র অনীহা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার পরও বহু কর্মকর্তা তাদের সম্পদের হিসাব সরকারের কাছে পেশ করেননি।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে