×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

৭৭ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে জাপান

২০২৬ অক্টোবর ২৯ ১৯:০৭:১৬
৭৭ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে জাপান

নিজস্ব প্রতিবেদক: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে চীন, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও রয়েছে ঢাকার সামনে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য বিনিয়োগের পূর্বাভাস; পুরো অর্থ ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, এমন নয়।

দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে। জাপান বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ দেওয়ার জন্য অনুদান চুক্তিও করেছে।

ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পেও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে এসব প্রকল্পে জাপান, চীন ও অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজে কাজ করছে। তাই পুরো মেট্রোরেল প্রকল্প কোনো এক দেশকে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি যথাযথ হবে না।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে। চলতি বছরের জুনে চীন বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটির লক্ষ্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানো, পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ উন্নত করা এবং পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানো।

এ ছাড়া, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংযোগ বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে সুবিধা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তবে প্রস্তাবিত করিডোরকে বাস্তবায়িত বাণিজ্যপথ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হলো চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ একর জায়গার এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ বা প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অঞ্চলটিতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশা রয়েছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প। জাপানের সহযোগিতায় বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই এলাকায় শিল্প, জ্বালানি ও লজিস্টিকস সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। জাপান-বাংলাদেশ শীর্ষ বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতেও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে অভিন্ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বঙ্গোপসাগরীয় বন্দরগুলোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাতারবাড়ি বন্দরকে ঘিরে ভারত-জাপানের নির্দিষ্ট কোনো সামরিক বা ভূরাজনৈতিক জোটের দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন দিয়ে তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে অবকাঠামো ও শিল্পায়নে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, অন্যদিকে ঋণের শর্ত, প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

এ কারণে বাংলাদেশের কূটনীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল অর্জন করা যায়, তার ওপর। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়িত প্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ, বন্দর, জ্বালানি ও শিল্পায়নে বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সুযোগের সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে শুধু প্রভাব বিস্তারের লড়াই হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনার দিক থেকেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সাদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে