×
ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ইউএইতে জনতা ব্যাংকের ৪ শাখা বন্ধের শঙ্কা, জরুরি বৈঠক চায় বোর্ড

২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৮:১০:০৬
ইউএইতে জনতা ব্যাংকের ৪ শাখা বন্ধের শঙ্কা, জরুরি বৈঠক চায় বোর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ঠেকাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা বোর্ড। এ সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউএইতে বাংলাদেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সোমবার পাঠানো এক চিঠিতে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহঃ ফজলুর রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান। চিঠিতে ইউএইতে ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখা এবং শাখা বন্ধের প্রক্রিয়া থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চিঠি অনুযায়ী, ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া তদারকির জন্য নিরীক্ষা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্রো ইউএইকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউএইতে ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে সংকটের সূত্রপাত হয় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনের শর্ত পূরণ করতে না পারায়।

২০২১ সালে বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের শর্ত ৪ কোটি দিরহাম থেকে বাড়িয়ে ৪০ কোটি দিরহাম করে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু দেশটিতে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ছিল ১০ কোটি দিরহাম। এর সঙ্গে ৮ কোটি ৩০ লাখ দিরহাম সংরক্ষিত মুনাফা যোগ করেও নির্ধারিত মূলধনের শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘাটতির কারণে গত ৮ জুলাই থেকে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে ১৫ জুলাই ব্যাংকটিকে সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে নতুন গ্রাহক গ্রহণ ও নতুন হিসাব খোলা বন্ধ করে বিদ্যমান দায় পরিশোধের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। ফলে ইউএইতে জনতা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকার ও জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে মূলধন জোগানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে ৩০ কোটি দিরহাম, যা প্রায় ৮ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, পাঠানো হলেও ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা মূলধন হিসেবে গ্রহণ করেনি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান অনুযায়ী, মূলধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণে ঘাটতি থাকায় কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।

জনতা ব্যাংক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অর্থ ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে থাকা জনতা ব্যাংকের নস্ট্রো হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই অর্থ অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ট্রেজারি বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নস্ট্রো হিসাব হলো বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্য দেশের ব্যাংকে রাখা কোনো ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব।

এদিকে, ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গত ১৮ আগস্ট দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে ২০০ কোটি দিরহাম মূলধন জোগানের প্রতিশ্রুতি এবং শাখাপ্রতি ন্যূনতম মূলধন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউএইতে ব্যাংকটির চারটি শাখা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার আমানতকারী, ৩ হাজার ৮০০ ঋণগ্রহীতা এবং প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরক সেবা পান।

ব্যাংকটির মাধ্যমে ইউএই থেকে বছরে আনুমানিক ৮০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আসে। ফলে শাখাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইউএইতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি অংশ জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিয়ে থাকেন। কার্যক্রম বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে তাঁদের বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা খুঁজতে হতে পারে। একই সঙ্গে আমানত নিষ্পত্তি, ঋণ আদায় এবং বিদ্যমান গ্রাহকসেবা পরিচালনার বিষয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জনতা ব্যাংক ১৯৭৪ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিনের এ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে শুধু গ্রাহকসেবাই নয়, ব্যাংকটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক দায়দায়িত্বের বিষয়েও প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হলে গ্রাহকদের আমানত ও ঋণ নিষ্পত্তি, কর্মীদের ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিলের ব্যয় বহন করতে হবে। এতে ব্যাংকটির ওপর অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করে মূলধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং কার্যক্রম চালু রাখার সম্ভাব্য পথ খুঁজতে চায় জনতা ব্যাংকের বোর্ড।

সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নির্ধারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটির বোর্ডের মতে, বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ, ইউএইতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ও গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে সরকারের প্রস্তাবিত উদ্যোগের পর কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ পুনর্বিবেচনা করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে