×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

এনবিআরকে দুই ভাগ করার বিল, নতুন কাঠামো নিয়ে বড় আলোচনা

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১১:৪৪:১৩
এনবিআরকে দুই ভাগ করার বিল, নতুন কাঠামো নিয়ে বড় আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী সংসদ অধিবেশনে বিল উত্থাপন করতে পারে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকার গঠিত নয় সদস্যের একটি কমিটি প্রস্তাবিত পুনর্গঠন নিয়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে বিভাগ দুটির নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে মতপার্থক্য থাকায় সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, এনবিআরকে বিভক্ত করে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠন করা হবে। রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পৃথক করাই এ পুনর্গঠনের অন্যতম লক্ষ্য। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, কমিটির প্রতিবেদনে বিভাগ দুটি গঠন এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান হিসেবে আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজস্ব নীতি বিভাগকে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালনার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভাগটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। ফলে নেতৃত্ব কাঠামো চূড়ান্ত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনবিআরের তিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী সংসদ অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত বিল উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিল উত্থাপন ও পাসের পরও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে। ফলে নতুন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিকভাবে নাও হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বাধীন নয় সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে সুপারিশ জমা দিয়েছে। তবে কমিটির কয়েকজন সদস্য প্রস্তাবের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কমিটির প্রধান, সদস্য রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, এনবিআরকে দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। দেরিতে হলেও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।

তবে তাঁর বক্তব্য, শুধু কাঠামোগত বিভাজন করলেই রাজস্ব প্রশাসনের সমস্যার সমাধান হবে না। পুনর্গঠনের মাধ্যমে কী লক্ষ্য অর্জন করতে চায় সরকার, তা স্পষ্ট করে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ উদ্যোগ রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারে।

রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পৃথক করার লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এনবিআর পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সমর্থনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সংস্কার-সংক্রান্ত সুপারিশও এ উদ্যোগের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার বৃহত্তর রাজস্ব সংস্কারের অংশ হিসেবে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করে। তবে এর প্রতিবাদ জানান আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, রাজস্ব সংস্কার কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বিভাগ দুটির নেতৃত্বে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সরকারি নির্দেশনা পালন নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, পাঁচজনকে অবসরে পাঠানো এবং কয়েক শ কর্মকর্তাকে বদলির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পদ নিয়েও অনুসন্ধান শুরু করে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংশোধিত গেজেট প্রকাশের পর কিছু উদ্বেগ কমলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে নির্বাচনের আগে বিভাগ দুটি কার্যকর করার আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক মতবিরোধের কারণে তা এগোয়নি বলে জানা যায়।

গত ২৮ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাত সচিবকে আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের দাবিও জানানো হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্বাচনের আগে বিভাগ দুটিতে সচিব নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করতে প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এর পর সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি থমকে যায়।

তবে আইএমএফের সুপারিশসহ রাজস্ব প্রশাসন সংস্কারের বিভিন্ন চাপ ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সরকার আবারও উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে বিল উত্থাপিত হলে এনবিআরের ভবিষ্যৎ কাঠামো, নেতৃত্ব এবং রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে