×
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ভারতীয় চালের ভ-য়ং-ক-র রহস্য!

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ২১:০৭:৩৭
ভারতীয় চালের ভ-য়ং-ক-র রহস্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারত থেকে আমদানি করা চালের একটি চালানে প্রাণঘাতী আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার অভিযোগ ঘিরে খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের মান পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে চালের চালান পৌঁছানোর পর খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের একটি পরিদর্শক দল প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চালকে খাওয়ার উপযোগী ঘোষণা করে ছাড়পত্র দেয়। পরে চাল চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট ও হালিশহরের কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামে (সিএসডি) পাঠানো হয়।

গুদামে চালের রং, পোকা ও দুর্গন্ধ নিয়ে অভিযোগ

গুদামে চালের বস্তা খোলার পর অস্বাভাবিক রং, পোকামাকড় ও তীব্র দুর্গন্ধ দেখা যায় বলে অভিযোগ করেন শ্রমিক, পরিবহন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, চালের অবস্থা দেখে সেটি মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে চাল পরিবহন ও বিতরণে আপত্তি জানান সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরীক্ষায় ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিন শনাক্তের দাবি

অভিযোগের পর গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) শস্য মান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল গুদাম থেকে চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা চালায়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় হালিশহর গুদামে থাকা ১৩৫ টন চালে মাত্রাতিরিক্ত আফলাটক্সিন শনাক্ত হয়।

তবে পরীক্ষার মূল প্রতিবেদন, বিষের পরিমাণ, গ্রহণযোগ্য সীমা এবং নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্য নিশ্চিত হলেই চালের দূষণের মাত্রা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

আফলাটক্সিন কী, কেন এটি বিপজ্জনক?

আফলাটক্সিন হলো নির্দিষ্ট প্রজাতির ছত্রাক, বিশেষ করে Aspergillus flavus ও Aspergillus parasiticus থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ। অনুকূল আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় সংরক্ষিত শস্যে এসব ছত্রাক জন্মাতে পারে। আফলাটক্সিনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ রান্নার তাপে এটি পুরোপুরি নষ্ট নাও হতে পারে। তাই দূষিত চাল রান্না করলেই তা নিরাপদ হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আফলাটক্সিনের সংস্পর্শে আসা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে লিভারের ক্ষতি ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট চালের চালানে বিষ শনাক্ত হওয়ার দাবি থেকে সেটি খাওয়া মানুষের মধ্যে রোগ হয়েছে বলে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; এর জন্য আলাদা স্বাস্থ্যতথ্য ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

চাল বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন, কোথায় ছিল তদারকি?

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পরীক্ষায় দূষণের বিষয়টি সামনে আসার পর চাল বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আমদানি করা চালের একটি অংশ এর আগেই ওএমএস ও রেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে কতটুকু চাল বিতরণ হয়েছে, কোন কোন এলাকায় গেছে এবং কতজনের কাছে পৌঁছেছে—এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

যদি প্রাথমিক পরীক্ষায় চালকে নিরাপদ ঘোষণা করা হয়ে থাকে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় তাতে মাত্রাতিরিক্ত আফলাটক্সিন পাওয়া যায়, তাহলে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারের মান নিয়ন্ত্রণ, ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং গুদামে চাল সংরক্ষণের পদ্ধতি—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

ঘটনাটি নিয়ে প্রধান প্রশ্ন হলো, প্রথম পরীক্ষায় দূষণ শনাক্ত হয়নি কেন এবং পরবর্তী পরীক্ষায় কীভাবে তা ধরা পড়ল। এর পেছনে পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, নমুনা সংগ্রহের ত্রুটি, সংরক্ষণজনিত সমস্যা নাকি দায়িত্ব পালনে অবহেলা ছিল—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দুর্নীতি বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে প্রমাণও তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চালের অবশিষ্ট মজুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা, বিতরণ হয়ে থাকলে তার পরিধি নির্ধারণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। তদন্তের ফল প্রকাশ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে