×
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ঋণ কেলেঙ্কারির ভারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আইএফআইসি ব্যাংক

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ০৬:১৭:১৩
ঋণ কেলেঙ্কারির ভারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আইএফআইসি ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি ২০২৫ সালে আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে বিশাল ঘাটতির পাশাপাশি সুদ আয় কমে যাওয়া এবং সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসান বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বছর শেষে ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই সময়ে পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০২৪ সালেও লোকসানে থাকা ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে এক বছরের ব্যবধানে।

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সাবেক সভাপতি এ এস এম শায়খুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতের অর্থকে ঋণের নামে লুটপাট করা হয়েছে, এটি সবাই জানে। এ কারণেই বেশ কিছু ব্যাংক এখন খেলাপিতে ভুগছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে চাচ্ছে। দেখা যাক কতটা সফল হয়।’

১৯৭৬ সালে যৌথ উদ্যোগের আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে আইএফআইসি। পরে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘ পথচলার পরও বর্তমানে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঋণঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারা এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থতা বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নেতৃত্ব ও প্রভাব নিয়েও অভিযোগ উঠেছিল। ঋণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও মামলা হয়েছে।

ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের ব্যবস্থাপনা আলোচনায় সঞ্চিতি সংরক্ষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরটিতে ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে ২২ হাজার ১০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করেছে মাত্র ৭৯২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ও সংরক্ষিত অর্থের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, পরিচালন মুনাফা না থাকায় নতুন করে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে সঞ্চিতি ঘাটতি সমন্বয় না করেই বার্ষিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকটির সুদ আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয়-ব্যয়ের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালে আইএফআইসির সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ টাকা, যেখানে ২০২৪ সালে এ আয় ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সুদ আয় কমেছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অন্যদিকে আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদ ব্যয় আগের বছরের ৩ হাজার ৭৪১ কোটি ১৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৪১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এতে সুদ আয় ও সুদ ব্যয়ের ব্যবধান ঋণাত্মক ২ হাজার ২০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বার্ষিক প্রতিবেদনে সুদ আয় ও ব্যয়ের এই নেতিবাচক ব্যবধানকে পরিচালন লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অথচ ২০২৪ সালে পরিচালন লোকসানের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ঋণের মানের অবনতি এবং নিট সুদ আয় কমে যাওয়াকে এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির চূড়ান্ত আর্থিক ফলাফলে। ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ১০২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার লোকসানের তুলনায় অনেক বেশি।

লোকসান বৃদ্ধির কারণে শেয়ারপ্রতি আয়েও বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৫৩ পয়সা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির সঞ্চিত মুনাফার অবস্থাও পাল্টে গেছে। আগের বছরের শেষে ২১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার সঞ্চিত মুনাফার উদ্বৃত্ত থাকলেও ২০২৫ সাল শেষে তা ঋণাত্মক ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তবে আর্থিক সংকটের মধ্যেও পরিচালকদের ফি ও সম্মানী বাবদ ব্যয় বেড়েছে। সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৬ লাখ ১ হাজার ৮৩৩ টাকা। ২০২৪ সালে একই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৪ টাকা।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নিরীক্ষক ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি নির্ধারণ এবং সুদ আয় স্বীকৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা-বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে সুদ আয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভুল কিংবা জালিয়াতির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল সঞ্চিতি ঘাটতি, ঋণের মানের অবনতি এবং নিরীক্ষকের এসব পর্যবেক্ষণ ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে