×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ব্রোকারেজ হাউসে আর লুটপাট নয়: বিএসইসির নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ২২:১১:২৩
ব্রোকারেজ হাউসে আর লুটপাট নয়: বিএসইসির নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জমা রাখা ক্যাশ অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম ও মূলধন ঘাটতি দ্রুত শনাক্তকরণে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের সব ব্রোকারেজ হাউসকে একটি একক ও সমন্বিত ‘ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার’ ব্যবস্থার আওতায় আনতে ইতিমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে বিএসইসি।

প্রস্তাবিত এই প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে তা দিয়ে রিয়েল-টাইমে (তাত্ক্ষণিকভাবে) ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাংক হিসাব, গ্রাহকদের কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) এবং শেয়ার সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি তদারকি করা সম্ভব হবে। বিএসইসির প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে অর্থ বা শেয়ার গরমিল সংক্রান্ত যে কোনো অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

সম্প্রতি বিএসইসি কার্যালয়ে এ বিষয়ে এক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় এই সমন্বিত সফটওয়্যার প্রবর্তনের সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সুবিধা, আর্থিক ব্যয়, বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ এবং সাইবার ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে জালিয়াতি ও আত্মসাৎ বন্ধে সমন্বিত ব্যাক-অফিস প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিয়মিত বিরতিতে ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক ব্যালেন্সের সঙ্গে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবের আর্থিক তথ্য মিলিয়ে দেখলে অর্থ তছরুপের ঘটনা শুরুতেই ধরে ফেলা সম্ভব হবে।

কেন প্রয়োজন এই সমন্বিত সফটওয়্যার?

বর্তমানে দেশের ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিভিন্ন থার্ড-পার্টি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে। ফলে একক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে নজরদারি করা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টক এক্সচেঞ্জের জন্য অত্যন্ত জটিল। অনেক ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউসের মূল নথির সাথে বাস্তবে রাখা ব্যাংক হিসাব বা পোর্টফোলিওর অমিল ধরা পড়তে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

সমন্বিত ব্যবস্থা চালু হলে একদিকে যেমন ব্যাংকের ডেটার সাথে কাস্টমার অ্যাকাউন্টের অর্থের মিল দেখা যাবে, তেমনি সিডিবিএলের নথির সঙ্গে মেলানো যাবে শেয়ারের প্রকৃত পরিসংখ্যান। কোনো হাউসের অ্যাকাউন্টে ঘাটতি দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সংকেত চলে যাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে, যা তাৎক্ষণিক আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

বাস্তবায়ন ব্যয় ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান সফটওয়্যার ডেটা রূপান্তর (মাগ্রেশন), নতুন অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অতিরিক্ত খরচ করতে হবে। এছাড়া, পুরো শেয়ারবাজার যদি কোনো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার বা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সাইবার হামলা কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে সব ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেন একযোগে স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। এ কারণে শক্তিশালী ব্যাকআপ সার্ভার, সর্বাধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ও স্বাধীন অডিটিং ব্যবস্থার প্রস্তুতি রাখা আবশ্যক।

বিনিয়োগকারীদের সুবিধা ও ক্ষতিপূরণের চাপ

এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে গ্রাহকরা ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করে নিজস্ব ব্যালেন্স ও শেয়ারহোল্ডিং তথ্য সরাসরি যাচাই করতে পারবেন। যেকোনো অস্বাভাবিক লেনদেনের বার্তা মেসেজ বা ইমেইলে দ্রুত পৌঁছে যাবে বিনিয়োগকারীর কাছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের ৬টি বড় ব্রোকারেজ হাউস প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠে। যার মধ্যে মশিউর সিকিউরিটিজ ১৬১ কোটি, তামহা সিকিউরিটিজ ১৪০ কোটি, ব্যাংক সিকিউরিটিজ ১২৮ কোটি, সালতা ক্যাপিটাল ১০০ কোটি, ক্রস্ট সিকিউরিটিজ ৬৫ কোটি এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজ ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ধরনের চরম অনিয়ম ঠেকাতেই সার্বক্ষণিক নজরদারির তাগিদ তৈরি হয়েছে।

ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭,৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ডিএসই-র ‘ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড’ থেকে ২৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এর মধ্যে ৭২ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনিয়মের পর ক্ষতিপূরণ দেওয়া স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং অনিয়ম হওয়ার আগেই প্রযুক্তি দিয়ে তা আটকে দেওয়া বিএসইসির নতুন এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর তথ্য ও গ্রাহকের আমানত তদারকিতে একই ধরণের উচ্চ প্রযুক্তির তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE), পাকিস্তানের পিএসএক্স (PSX), সিঙ্গাপুরের এমএএস (MAS) এবং হংকংয়ের এসএফসি (SFC) স্ব-স্ব দেশে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাক-অফিস ডেটা ও নগদ অর্থ নিয়মিত অডিট ও তদারকির আওতায় রাখে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে