×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে জমির নামজারি? জেনে নিন কী বলছে নিয়ম

২০২৬ অক্টোবর ২২ ১৭:১৮:৫৫
ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে জমির নামজারি? জেনে নিন কী বলছে নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির সরকারি রেকর্ডে মালিকানার তথ্য হালনাগাদ করতে নামজারি করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের অধিকার নিশ্চিত করতে যৌথ নামজারি এবং পৃথক খতিয়ান তৈরির নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির আনুষ্ঠানিক বণ্টন না হলে সব ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করা যায়। অন্যদিকে, ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন হয়। ফলে জমির নামজারির আবেদন করার আগে উত্তরাধিকারীদের তথ্য, জমির দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত করা জরুরি।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া জমিতে আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিশের যে অংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের খতিয়ানে সহ-অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে অন্য ওয়ারিশের নামে পুরো জমির নামজারি করার চেষ্টা করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে ওয়ারিশদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং তাঁদের প্রাপ্য অংশ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ওয়ারিশদের মধ্যে জমির আনুষ্ঠানিক ভাগ-বণ্টন না হলে যৌথ নামজারির আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে শুধু নিবন্ধিত বণ্টননামা নেই—এ কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করার কথা নয়। তবে জমির অংশ আলাদা করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন হবে।

অর্থাৎ, যৌথভাবে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশের জন্য পৃথক খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়। আবেদন করার সময় কোন ধরনের নামজারি প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা জরুরি।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ গুরুত্বপূর্ণ নথি। সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে এই সনদ সংগ্রহ করা যায়।

ওয়ারিশ সনদে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। নাম, পরিচয় বা অন্যান্য তথ্যে ভুল থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদসহ অতিরিক্ত নথিও জমা দিতে হতে পারে।

ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে প্রথমে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী বণ্টননামা প্রস্তুত করে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর নিবন্ধিত বণ্টননামায় উল্লেখিত অংশের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যায়।

এ ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, সীমানা এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি। জমির মালিকানা বা বণ্টন নিয়ে বিরোধ থাকলে আবেদন নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

জমি কেনা, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে মালিকানা অর্জনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো হলো—

১. জমি কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের কপি।

২. আগের খতিয়ানের কপি।

৩. জমির দাগ নম্বর, পরিমাণ ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য।

৪. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।

৫. উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ।

৬. প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ।

৭. পৃথক খতিয়ানের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামা।

৮. নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধের তথ্য।

৯. সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা কর্তৃপক্ষের চাওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে দলিল, খতিয়ান, জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর এবং মালিকানার তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত। কাগজপত্রে অসংগতি থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।

অনলাইনে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে

জমির নামজারির আবেদন অনলাইনে করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করা যায়। আবেদন করার সময় নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে।

প্রথম ধাপ: সরকারি ভূমি সেবা পোর্টাল land.gov.bd–এ প্রবেশ করুন। সেখান থেকে ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করুন।

দ্বিতীয় ধাপ: নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদনপ্রক্রিয়া শুরু করুন। আবেদনকারীর পরিচয়, জমির অবস্থান, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং মালিকানা অর্জনের ধরনসংক্রান্ত তথ্য পূরণ করুন।

তৃতীয় ধাপ: জমি কেনার মাধ্যমে, নাকি উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পেয়েছেন, তা উল্লেখ করুন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য নির্ভুলভাবে দিন।

চতুর্থ ধাপ: প্রযোজ্য দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দেশনা অনুযায়ী সংযুক্ত করুন।

পঞ্চম ধাপ: আবেদন জমা দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করুন। আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া আবেদন নম্বর বা ট্র্যাকিং তথ্য সংরক্ষণ করুন।

ষষ্ঠ ধাপ: অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করুন। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হলে নির্ধারিত নিয়মে তা জমা দিন।

আবেদনের আগে সরকারি পোর্টালে প্রকাশিত সর্বশেষ নির্দেশনা, ফি এবং প্রয়োজনীয় নথির তালিকা যাচাই করা উচিত। জমির ধরন, কাগজপত্রের যথার্থতা এবং কোনো আপত্তি রয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করতে পারে।

জমি কেনার পর বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর ভূমি রেকর্ডে মালিকানার তথ্য হালনাগাদ না করলে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, জমি হস্তান্তর এবং মালিকানার তথ্য যাচাইয়ের সময় সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

এ ছাড়া জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে সঠিক ও হালনাগাদ নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি নিজে থেকেই জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠার একমাত্র প্রমাণ নয়। নিবন্ধিত দলিল, উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথি, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও বিবেচ্য।

তাই জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ, সব ওয়ারিশের অধিকার বিবেচনায় নেওয়া এবং যথাসময়ে নামজারি সম্পন্ন করা জরুরি। বিশেষ করে যৌথ নামজারি ও পৃথক খতিয়ানের নিয়মের পার্থক্য বুঝে আবেদন করলে পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সহজ হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে