×
ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ, তবু কেন আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ১৫:৩৫:২১
গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ, তবু কেন আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে সম্ভাব্য বিপুল গ্যাসসম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশীয়ভাবে তা উত্তোলনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। ফলে সম্ভাব্য দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের বদলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতির সঙ্গে একটি প্রভাবশালী আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ী চক্রের স্বার্থের সম্পর্ক থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এই বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়নি।

দেশীয় গ্যাস ও আমদানিকৃত এলএনজির ব্যয়ের পার্থক্য নিয়েও বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম হলেও আমদানিকৃত এলএনজির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ব্যয় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। ফলে বেশি দামে জ্বালানি আমদানির চাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা ও সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে।

জ্বালানি আমদানির সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার বাজারের চাপের বিষয়টিও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এলএনজি আমদানির জন্য বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে দেশে পর্যাপ্ত নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন করা গেলে আমদানি ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে এক্সনমোবিল ও শেভরনের মতো বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে এসব কোম্পানির আগ্রহ, প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধা এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে কি না—এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ প্রয়োজন।

বিশ্লেষণে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠলে প্রতিবেশী দেশের ওপর জ্বালানি-নির্ভরতা কমতে পারে এবং এ কারণে কোনো কোনো পক্ষ বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন বিলম্বিত করতে চাইতে পারে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এমন কোনো নীতি বা কর্মকাণ্ডের প্রমাণ এই বিশ্লেষণে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ ও বিশ্লেষণের পর্যায়েই রয়েছে।

সব মিলিয়ে আলোচনার মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য নিজস্ব গ্যাসসম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেন দেশকে ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যয়বহুল আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধান, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গভীর সমুদ্রের ব্লকে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা—এসব বিষয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের প্রকৃত মজুত, উত্তোলন ব্যয়, আমদানিকৃত এলএনজির প্রকৃত ব্যয় এবং গভীর সমুদ্রের অনুসন্ধানের সম্ভাবনা—এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পথ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে