×
ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিম জং উনের বিলাসী জীবনের অজানা তথ্য

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯ ১০:০৪:০৯
কিম জং উনের বিলাসী জীবনের অজানা তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের জীবনযাপন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে আসছে। একদিকে দেশটির সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ খাদ্যসংকট, দারিদ্র্য ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে জীবনযাপন করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে; অন্যদিকে কিমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে একাধিক বিলাসবহুল আবাসন, দামি গাড়ি, ব্যক্তিগত বিমান, ইয়ট, বিদেশি খাবার ও বিলাসবহুল পানীয়ের মতো নানা সম্পদের কথা। তবে উত্তর কোরিয়ার গোপনীয়তার কারণে এসব তথ্যের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালে ক্ষমতার শীর্ষে আসার পর থেকেই কিম জং উনের ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তার মোট সম্পদের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন অনুমান রয়েছে এবং কিছু প্রতিবেদনে তা কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বলা হয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এসব হিসাবকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।

একাধিক প্রাসাদ ও বিলাসবহুল আবাসন

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কিমের প্রায় ১৭টি প্রাসাদ বা বিলাসবহুল আবাসন রয়েছে। এর মধ্যে ওয়নসানের একটি প্রাসাদের সঙ্গে প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের একটি প্রধান আবাসনকে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত বলে বর্ণনা করা হয়।

কিছু প্রতিবেদনে ওই আবাসনের আশপাশে সামরিক ইউনিট, বৈদ্যুতিক বেড়া এবং মাইনফিল্ড থাকার দাবি করা হয়েছে। এমনকি ভূগর্ভস্থ রেলস্টেশন ও বিভিন্ন সম্পত্তির সঙ্গে সংযোগকারী টানেলের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যবস্থার সবকটির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

ব্যক্তিগত দ্বীপের দাবিও রয়েছে

কিম জং উনের ব্যক্তিগত অবকাশযাপনের জন্য একটি দ্বীপ রয়েছে বলেও বহু বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ২০১৩ সালে সাবেক এনবিএ তারকা ডেনিস রডম্যান কিমের সঙ্গে ওই দ্বীপে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।

রডম্যানের বর্ণনায়, দ্বীপটির পরিবেশ অনেকটা হাওয়াই বা ইবিজার মতো এবং সেখানে কিমের আশপাশে কয়েক ডজন মানুষ থাকতেন। দ্বীপে খাবার, পানীয় ও বিনোদনের জন্য বিলাসবহুল ব্যবস্থা ছিল বলেও তার বক্তব্য থেকে জানা যায়।

বিলাসবহুল বিমান, ইয়ট ও সাঁজোয়া গাড়ি

কিমের যাতায়াতের মাধ্যম নিয়েও নানা চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার ব্যক্তিগত ইয়ট, বিলাসবহুল বিমান ও সাঁজোয়া গাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ডেনিস রডম্যান কিমের একটি ইয়ট দেখেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। প্রায় ৯৫ ফুট দীর্ঘ ওই ইয়টকে ব্রিটিশ নকশার প্রিন্সেস ৯৫ এমওয়াই মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং এর মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিম এয়ার ফোর্স ওয়ান নামে পরিচিত একটি রুশ নির্মিত ইলিউশিন-৬২ বিমান ব্যবহার করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এমনকি তিনি নিজে কখনো কখনো বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন—এমন দাবিও রয়েছে। তবে তার কোনো পাইলট লাইসেন্স আছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য নেই।

সাঁজোয়া ট্রেনেও বিলাসবহুল ব্যবস্থা

উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতাদের সাঁজোয়া ট্রেনে ভ্রমণের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিমের বাবা কিম জং ইলও বিশেষ ট্রেনে ভ্রমণ করতেন এবং ২০১১ সালে ওই ট্রেনেই তার মৃত্যু হয় বলে উত্তর কোরিয়ার সরকারি সূত্র জানিয়েছিল।

কিম জং উনের ট্রেনেও বৈঠকের কক্ষ, শোবার কক্ষ এবং বিলাসবহুল আসবাবসহ নানা সুবিধা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তার একটি দামি মার্সিডিজ-মেবাখ সাঁজোয়া গাড়ি ট্রেনে বহন করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।

কিমের ব্যক্তিগত গাড়ির বহর নিয়েও নানা তথ্য রয়েছে। ইউরোপীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ি তার সংগ্রহে রয়েছে বলে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

‘প্লেজার স্কোয়াড’ নিয়ে বিতর্কিত তথ্য

কিমের জীবনযাপন নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত দাবিগুলোর একটি তথাকথিত ‘প্লেজার স্কোয়াড’ বা ‘গিপুমজো’কে ঘিরে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই গোষ্ঠীতে বিপুলসংখ্যক নারীকে রাখা হয় এবং তাদের বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়।

তবে এই দাবিগুলো মূলত উত্তর কোরিয়ার বাইরে থাকা সূত্র ও দেশত্যাগী সাবেক নাগরিকদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই গোষ্ঠীর প্রকৃত আকার, কার্যক্রম বা কিমের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে প্রকাশ্যে থাকা সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দামি ঘড়ি, খাবার ও পানীয়

কিম জং উনের পোশাক-পরিচ্ছদ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়েও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে তার দামি ঘড়ির সংগ্রহ নিয়ে নানা অনুমান রয়েছে। ২০১৯ সালে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় তাকে দামি সুইস ঘড়ি পরা অবস্থায় দেখা গেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

খাবারের ক্ষেত্রেও তার পছন্দ বিলাসবহুল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ফোয়া গ্রা, লবস্টার ও ক্যাভিয়ারের মতো খাবার তার পছন্দের তালিকায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশ সফরে নিজস্ব শেফদের একটি দল সঙ্গে থাকার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পানীয়ের ক্ষেত্রেও কিমের বিলাসী পছন্দের কথা বলা হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে দামি হুইস্কি আমদানির দাবি রয়েছে। তবে তার ব্যক্তিগত ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ—বিশেষ করে বছরে কত অর্থ পানীয় বা বিলাসপণ্যে ব্যয় হয়—এ ধরনের তথ্যের নির্ভরযোগ্য স্বাধীন যাচাই সীমিত।

বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ে নানা প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে উত্তর কোরিয়ায় বিলাসপণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। তারপরও দেশটিতে বিলাসবহুল গাড়ি, মদ, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন পণ্য প্রবেশের তথ্য বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।

কিছু প্রতিবেদনে ২০১৭ সালে বিপুল অর্থের বিলাসপণ্য আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এসব আমদানির পুরোটা কিমের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ছিল কি না, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।

বাস্কেটবল ও ঘোড়ার প্রতি আগ্রহ

কিম জং উনের ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যে বাস্কেটবলের কথা প্রায়ই উঠে আসে। সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনার সময় তার ঘরে মাইকেল জর্ডান ও শিকাগো বুলসের পোস্টার ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে হার্লেম গ্লোবট্রটার্স দলের সদস্যরা উত্তর কোরিয়ায় গিয়ে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিলেন। ওই সফরের সময় ডেনিস রডম্যানের সঙ্গে কিমের সম্পর্কও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে।

ঘোড়ার প্রতিও কিমের আগ্রহ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রুশ কাস্টমসের তথ্য উদ্ধৃত করে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়া বিপুল অর্থ ব্যয়ে বেশ কিছু খাঁটি জাতের ঘোড়া কিনেছিল। সরকারি প্রচারচিত্রেও কিমকে সাদা ঘোড়ায় চড়তে দেখা গেছে।

বিলাসবহুল স্কি রিসোর্ট

উত্তর কোরিয়ায় পর্যটন ও বিনোদন অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও কিমের উদ্যোগের কথা বলা হয়। এর অন্যতম উদাহরণ মাসিকরিয়ং স্কি রিসোর্ট। ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই রিসোর্ট নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিসোর্টটির জন্য বিদেশ থেকে স্কি-সংক্রান্ত সরঞ্জাম আনার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক ব্যবহারের অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে বড় বৈপরীত্য

কিম জং উনের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এর বৈপরীত্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেদনে দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত বিলাসবহুল জীবনযাপনের নানা তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তবে উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম গোপনীয় রাষ্ট্র হওয়ায় কিমের ব্যক্তিগত সম্পদ, প্রাসাদের সংখ্যা, ব্যয়ের পরিমাণ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দাবিকে সরাসরি নিশ্চিত করা কঠিন। এসব তথ্যের একটি অংশ স্যাটেলাইট ছবি, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, সাবেক উত্তর কোরীয় নাগরিক এবং অন্যান্য সূত্রের ওপর নির্ভরশীল।

তাই কিম জং উনের বিলাসী জীবন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের ক্ষেত্রে নিশ্চিত তথ্য, অনুমান এবং সূত্রনির্ভর দাবির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। তারপরও প্রকাশ্য ছবি, বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের জীবনযাত্রা এবং দেশটির সাধারণ মানুষের বাস্তবতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্যের চিত্র পাওয়া যায়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে