×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক ঋণ নিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, নেপথ্যে যেসব কারণ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১০:০৯:৩৪
ব্যাংক ঋণ নিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, নেপথ্যে যেসব কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি টানা পাঁচ মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হয়েছে। এর আগের মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।

জুলাইয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। ফলে জুলাই পর্যন্ত বাস্তব প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মে মাসে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়। এরপর জুনে প্রবৃদ্ধি নেমে যায় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হলেও টানা পঞ্চম মাসের মতো তা ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচনের পর দেশে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগের কার্যক্রম বাড়বে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদাও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ায় নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। তবে সামনের মাসগুলোতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কিছুটা বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যাংকারদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এ সময়ে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে না গিয়ে উৎপাদন কমিয়েছেন। বিভিন্ন বড় শিল্পগোষ্ঠীর কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। কার্যক্রম চালু থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর প্রভাব সামগ্রিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে পড়েছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ বাড়ার জন্য ঋণের চাহিদা থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের নতুন ব্যবসা বা বিনিয়োগের তেমন পরিকল্পনা নেই। তার মতে, গ্যাস ও তেলের সংকটের কারণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং জ্বালানি সংকটই বর্তমানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের রেকর্ড কম প্রবৃদ্ধির পেছনে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই সমস্যা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আরও সতর্ক হয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করছে।

অন্যদিকে ঋণের চাহিদা কমার পেছনে গ্যাস সংকট, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন এই ব্যাংকার। তার মতে, এসব কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন কিংবা বাতিল করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কিছু এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে একদিকে ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে বাড়তি সতর্কতা কাজ করছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করছে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে