×
ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের ধরতে পুলিশের নতুন অভিযান

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৬:৪৪:২২
ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের ধরতে পুলিশের নতুন অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। ওই সময় সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের সময়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে শীর্ষ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন এবং অবৈধভাবে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে। এবার সেই সময়ের নেপথ্যের কুশীলব ও সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে তৎপর হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এরই মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে একাধিক দফায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জানিয়েছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা সংশ্লিষ্টদের প্রোফাইল তৈরির কাজ প্রায় শেষ করেছে। দেশে অবস্থানকারীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আর বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন পেলেই এ বিষয়ে ইন্টারপোলে চিঠি পাঠানো হবে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং নির্বাচন বর্জনের পরিস্থিতিতে সেনা হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং আত্মপ্রকাশ করে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরবর্তী দুই বছরের কর্মকাণ্ডে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মূল কারিগর হিসেবে আলোচনায় আসেন। ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’কে কেন্দ্র করে শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং আর্থিকভাবে হয়রানির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করে।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কারাবন্দি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে দুই দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। তাদের অনেককে ডিজিএফআই কার্যালয় ও টিএফআই সেলে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা তারেক রহমানও নির্যাতনের শিকার হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্টারপোলের সহায়তা চাচ্ছে পুলিশ

পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিরাজনীতিকরণ ও ‘মাইনাস টু’ নীতির পক্ষে যারা তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তন এবং আইনি ব্যবস্থার আশঙ্কায় তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে চলে যান। মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহার ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিচারের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া হবে।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি তালিকা ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। ইন্টারপোলের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগও হয়েছে বলে তিনি জানান। তার দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময় কয়েকজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের বেসামরিক সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছিল। ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর নামে রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে হয়রানি এবং অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

তলব করেও ফেরানো যায়নি ফজলুল বারীকে

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদও দেশটিতে রয়েছেন।

ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর দেশে ফেরেননি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশ ছাড়েন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি আর ফেরেননি।

শিক্ষক পরিচয়ে দেশ ছাড়েন ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা

সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিএম আমিন বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় ডিজিএফআইয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমিন পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং অবসরের আগে আনসারের মহাপরিচালক ছিলেন।

২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন তিনি। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশ ছাড়েন। পরে আর বাংলাদেশে ফেরেননি। একই সময়ে ডিজিএফআইয়ের আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই ও কানাডার মধ্যে যাতায়াত করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তলবের খবর পেয়ে দেশ ছাড়েন ফখরুদ্দীন

পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন বাংলাদেশেই ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তখন তিনি দেশে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর সরকার তাকে নিরাপত্তাও দেয় এবং গুলশানে সরকারি একটি বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে ওই বছরের মে মাসে তাকে সংসদীয় কমিটিতে তলব এবং বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত হতে পারে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। মার্কিন নাগরিক হওয়ায় মেরিল্যান্ডের পটোম্যাকে বাড়ি কেনেন। সেখানে তার দুটি বাড়ির একটিতে তিনি পরিবারসহ থাকেন, অন্যটিতে মেয়ের পরিবার বসবাস করে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও বাংলাদেশি কমিউনিটি এড়িয়ে চলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে তাকে নিউ ইয়র্কে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ অবসরে যান। বিডিআর বিদ্রোহের সময় তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। ওই ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কমিশনের তদন্তে বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

২০০৯ সালের ১৪ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। শুরুতে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের সঙ্গে ছিলেন। পরে তার ‘মালটিপল মাইলোনা’ ক্যানসার শনাক্ত হয়। চিকিৎসার জন্য একসময় নিয়মিত নিউ ইয়র্কে যাতায়াত করলেও বর্তমানে সেখানে যাচ্ছেন না। এখন ফ্লোরিডার পামবিচে বসবাস করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

হদিস নেই দুদকের সাবেক চেয়ারম্যানের

ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী ওই সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ও মামলা নিয়ে দুদক ব্যাপক আলোচনায় আসে। সরকার পরিবর্তনের পর সমালোচনার মুখে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

পদত্যাগের পর থেকেই তিনি অনেকটা আড়ালে চলে যান। কিছুদিন ঢাকার ডিওএইচএসের বাসায় থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

দেশে থাকা অভিযুক্তদেরও নজরদারি

ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি অংশ এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের ওপরও নজরদারি শুরু হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার দাবি, ওই সময় সুবিধাভোগী সাবেক আমলা, বিতর্কিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পুলিশ এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর। তবে তার দেওয়া তথ্যগুলো এখনো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

রেহাইয়ের সুযোগ নেই, বলছেন আইন বিশ্লেষকরা

সুশীল সমাজ, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা হতে পারে।

একজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে সংঘটিত কর্মকাণ্ড দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। তার মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন বা বিলম্ব ঘটাতে অসাংবিধানিক পদক্ষেপ এবং নাগরিকদের ওপর জবরদস্তিমূলক নির্যাতনের অভিযোগ থেকে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তির সুযোগ নেই।

তার মতে, পুলিশের আন্তর্জাতিক শাখাকে আরও সক্রিয় করে ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যের ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কিংবা প্রচলিত আদালতে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে