ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ার কারসাজিতে লাভেলোর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ বিএসইসির

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০১ ১০:৪৯:৩৩
শেয়ার কারসাজিতে লাভেলোর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ বিএসইসির

নিজস্ব প্রতিবেদক: খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আট ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। একই ঘটনায় আরও দুই ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া চীনা উদ্যোক্তা ঝুয়াং লিফেং ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় ঝুয়াং লিফেংকে ঘিরে একটি সহযোগী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুয়াং লিফেং চীনা নাগরিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। দেশের পোশাক ও আর্থিক খাতের ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে। তার দুটি প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের নামও এই তদন্তে এসেছে।

বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজকে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই ঘটনায় এইচএম রুবাইয়াতকে ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা, শায়লা আক্তারকে ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, রাজন কুমার সাহাকে ২ লাখ টাকা, তাসলিমা কাননকে ৩৩ লাখ টাকা, মো. মাসুদ রানাকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আবু সাদাত মো. ফয়সালকে ৪৫ লাখ টাকা, আদিবা আজাদকে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মোহাম্মদ আরিফ হোসাইনকে ৫৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

তবে শুধু জরিমানার মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকছে না। তদন্তে কারসাজির অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করে লাভেলো আইসক্রিমের চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তার নিকটাত্মীয় মো. জাহেদুল হক এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তবে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, এখনো মামলা করা হয়নি। বিষয়টি আইন বিভাগ পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

বিএসইসির তদন্তে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করা হয়। তদন্তে ওই সময়ে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে কমিশনের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারদর ছিল ২৯ টাকা ৮০ পয়সা। এরপর কয়েক মাসে শেয়ারটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। ১৫ জুলাই দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ টাকা ৪০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম ৭৬ টাকা ৬০ পয়সা বা প্রায় ২৫৭ শতাংশ বেড়েছিল।

তদন্তে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যোগসাজশের মাধ্যমে শেয়ার লেনদেন এবং বিধিবহির্ভূতভাবে মুনাফা অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিএসইসির তদন্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(৫) ধারা, ২০১০ সালের ১৪ জুলাই কমিশনের নোটিফিকেশন এবং সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫(১) লঙ্ঘন করেছেন।

শেয়ারটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং লেনদেনের ধরনকে কেন্দ্র করেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দাম ও লেনদেনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ধরন, বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম এবং তাদের পারস্পরিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হয়। লাভেলো আইসক্রিমের ক্ষেত্রেও লেনদেনের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে শেয়ারবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে বিএসইসির কঠোর অবস্থানের মধ্যেই লাভেলোর ঘটনায় এই সিদ্ধান্ত এসেছে। কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং আইন প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিএসইসির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন কমিশন সভা ও শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনে করেন, শুধু জরিমানা করলে তা আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগের ধরন ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হলে বাজারে অযথা আতঙ্ক তৈরির কথা নয়। তার মতে, মামলা করার আগে কমিশনকে অভিযোগের আইনি ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে এগোতে হবে। সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি দুর্বল হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে কমিশন আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা রাখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও কারসাজির বিভিন্ন ঘটনায় কমিশনের তদন্ত ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমও জোরদার হয়েছে।

লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনের ঘটনায় এখন জরিমানা আর সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। ফৌজদারি মামলা হলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। একইভাবে শেয়ারটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে কমিশনের চূড়ান্ত নথি ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে পূর্ণ চিত্র।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক হারে বাড়লে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ শুধু শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বিনিয়োগকারীদের জেনে-বুঝে এবং ঝুঁকি বিবেচনা করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে