×
ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম বোর্ডে ফের ফল জালিয়াতি, তদন্তে নতুন রহস্য

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৬:২৫:৪৩
চট্টগ্রাম বোর্ডে ফের ফল জালিয়াতি, তদন্তে নতুন রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ফের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে। পুনঃনিরীক্ষণের সময় এক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্রে পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। শুধু একটি নয়, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা তিনটি বিষয়ের খাতাতেই এমন অমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি সামনে আসার পর ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা বোর্ড।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য একটি শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র আনা হলে পরীক্ষকরা খাতায় পাওয়া নম্বর এবং কম্পিউটারে থাকা প্রকাশিত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পান। পরবর্তী যাচাইয়ে ওই শিক্ষার্থীর আরও দুটি বিষয়ের খাতাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

গত ২৫ আগস্ট বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে জানান। এরপর একই দিন বোর্ড সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের তদন্তের কাজ প্রায় শেষ করেছে।

এক বিষয় ছাড়া সবখানেই অমিল

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর প্রায় সব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বরেই অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে মাত্র একটি বিষয়ে পাস করেছিল বলে জানা গেছে। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে তার জিপিএ ছিল ৪ দশমিক ৯৪।

প্রকাশিত ফলাফলে বাংলা দুই পত্র মিলিয়ে ‘এ মাইনাস’ বা ১২০ নম্বর, রসায়নে ‘এ’ বা ৭৮ এবং আইসিটিতে ‘এ’ বা ৩৭ নম্বর দেখানো হয়েছে। বাকি বিষয়গুলোতে দেওয়া হয়েছে ‘এ প্লাস’। পুনঃনিরীক্ষণের সময় তিন বিষয়ের নম্বরের পার্থক্য ধরা পড়ার পর অন্য উত্তরপত্রগুলোও পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও খাতায় পাওয়া নম্বর ও প্রকাশিত নম্বরের মধ্যে অমিল পাওয়া যায়। একটি সূত্রের দাবি, বাংলা প্রথমপত্র ছাড়া প্রায় সব বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বরে পার্থক্য রয়েছে।

যেভাবে ধরা পড়ে অসঙ্গতি

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণের সময় একজন পরীক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের একটি খাতায় অস্বাভাবিকতা দেখতে পান। খাতায় যেখানে শূন্য নম্বর ছিল, প্রকাশিত ফলাফলের প্রিন্টে সেখানে ৪৫ নম্বর দেখা যায়।

পরে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মোহাম্মদ আবদুল মন্নান কম্পিউটার সেন্টারের ডাটার সঙ্গে খাতার নম্বর মিলিয়ে একই অসঙ্গতি দেখতে পান। এরপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) এবং উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চ মাধ্যমিক) প্রফেসর মোহাম্মদ দিদারুল আলম বিষয়টি লিখিতভাবে চেয়ারম্যানকে জানান। চেয়ারম্যান তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

তিন বিষয়ে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন

অভিযুক্ত শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিল বলে বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। পদার্থবিজ্ঞানের খাতায় অমিল ধরা পড়ার পর অন্য দুটি বিষয়ের খাতাও যাচাই করা হয়। পরে অন্যান্য বিষয়ের উত্তরপত্রও তলব করা হলে সেখানেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

তবে শিক্ষার্থীর বাবা আবু শাহেদ হারুন পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি বা পরিবারের কেউ এ ধরনের আবেদন করেননি। তার বিরোধী কোনো পক্ষ হয়তো আবেদন করে থাকতে পারে।

শিক্ষার্থীর মা রুবিনা আকতারও একই কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রকাশিত ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে তারা কোনো পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেননি।

তদন্তে স্কুলের প্রধান শিক্ষক-অভিভাবক

অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তদন্ত কমিটি ওই শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে বিদ্যালয়ের কাছে তথ্য চেয়েছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম ফরহাদ জানান, শিক্ষা বোর্ডের সচিব তার কাছে শিক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল জানতে চেয়েছিলেন। তিনি বোর্ডকে নির্বাচনী পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফলের একটি কপি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর ফলাফল সন্তোষজনক ছিল না। এরপরও বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

সার্ভার থেকেও সরানো হয়েছে ফল

বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে যাতে ওই শিক্ষার্থী আবেদন করতে না পারে, সে জন্য তার ফলাফল সার্ভার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এ ছাড়া ফল প্রকাশের দিন আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের ইআইএন নম্বরের বিপরীতে প্রকাশিত সামগ্রিক ফলাফলেও শিক্ষার্থীর ফল ছিল। তবে পরে প্রতিষ্ঠানটির ইআইএন নম্বর দিয়ে ফলাফল ডাউনলোড করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট রোল নম্বরটি আর নেই। শিক্ষার্থীর রোল নম্বর দিয়েও পৃথকভাবে ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।

‘জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে’

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। কীভাবে এই ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে কমিটির সদস্যরা কাজ করছেন।

তিনি বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমে বিস্তারিত বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে এবার কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

চেয়ারম্যানের আদেশে গঠিত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। এরই মধ্যে নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সচিব বলেন, তারা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে আরও তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।

এর আগেও ফলাফল নিয়ে অনিয়ম

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের সময় ৩৪টি উত্তরপত্রে বাড়তি নম্বর দেওয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল।

বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ জানান, পুনঃনিরীক্ষণের সময় পরীক্ষকরা খাতায় প্রকৃত নম্বর লিখেছিলেন। কিন্তু ফলাফল শিটে ৩৪টি উত্তরপত্রে অতিরিক্ত নম্বর ইনপুট দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি শনাক্ত করে প্রকৃত নম্বর বসিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করা হয়।

তখন কম্পিউটার সেন্টারে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি। তার মতে, বোর্ড চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেন।

এরও আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফলে ১১টি পত্রে নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মামলা হয় এবং গত মাসে মামলার চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে।

ফল জালিয়াতির কেন্দ্র কম্পিউটার সেন্টার?

বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফলাফল সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগগুলো মূলত কম্পিউটার সেন্টারকে ঘিরেই উঠে এসেছে। প্রধান পরীক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া নম্বরকে ‘এইচ’ টাইপ এবং পরীক্ষার হল থেকে আগেই স্ক্যান করে সার্ভারে সংরক্ষিত উত্তরপত্রের প্রথম অংশকে ‘ই’ টাইপ বলা হয়।

প্রথমে ‘ই’ টাইপ সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে প্রধান পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের ‘এইচ’ টাইপও স্ক্যান করে যুক্ত করা হয়। ফল প্রকাশের কয়েকদিন আগে ডি-কোডিংয়ের মাধ্যমে লিথু কোড ব্যবহার করে দুই ধরনের তথ্য মিলিয়ে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর নির্ধারণ করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ পর্যায়ে কম্পিউটার সেন্টারের কেউ শিক্ষার্থীর পরিচয় জানতে পারলে তার নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনাতেও এমন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল বলে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় কম্পিউটার সেন্টারে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা তিন অপারেটরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

পুনঃনিরীক্ষণে প্রায় ৪০ হাজার আবেদন

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন।

ফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য এবার আবেদন করেছে ৩৯ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। আগামী ১০ অথবা ১১ সেপ্টেম্বর পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে