×
ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাজেয়াপ্ত হবে হাসিনার সম্পদ, সম্পদের উত্তরাধিকার হবেন যারা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১০:০১:২০
বাজেয়াপ্ত হবে হাসিনার সম্পদ, সম্পদের উত্তরাধিকার হবেন যারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা কার্যকর করার প্রক্রিয়া নির্ধারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যপ্রণালি (বিধি) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সংশোধন সম্পন্ন হলে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ থাকলেও কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন সংস্থার মাধ্যমে এসব সম্পদ আদায় ও বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিদ্যমান কার্যপ্রণালিতে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এ কারণে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করা হবে এবং ট্রাইব্যুনালকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে। এরপর ট্রাইব্যুনালই কার্যপ্রণালি সংশোধনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর আগে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ কার্যকর করার নজির ট্রাইব্যুনালে নেই বলেও জানান তিনি।

ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম বলেন, দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে, তা বিদ্যমান আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

এ কারণে সম্পদ বাজেয়াপ্ত, নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, বিক্রি বা আদায় এবং পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বণ্টনের প্রক্রিয়া নির্ধারণে নতুন বিধি প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ও বিষয়টি নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।

দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে কীভাবে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে—এ বিষয়ে গত ১২ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাছে নির্দেশনা চান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের বর্তমান কার্যপ্রণালিতেও সম্পদ বাজেয়াপ্তের পর তা বাস্তবায়নের বিস্তারিত প্রক্রিয়া উল্লেখ নেই। ফলে আদালত কোনো দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দিলেও সেটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

জবাবে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এ বিষয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। ট্রাইব্যুনাল-১, ট্রাইব্যুনাল-২ এবং চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় যৌথভাবে বসে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বণ্টনের বিষয়ে কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওই রায়েই শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও কয়েকটি মামলায় দণ্ড ঘোষণা হয়েছে। এসব মামলার রায়েও বিভিন্ন আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ এলে একই ধরনের প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে।

সাম্প্রতিক ছয়টি মামলার রায়ে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে। আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ও পরবর্তী সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়েও একই আইনি কাঠামো প্রয়োজন হবে।

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন।

হলফনামায় কৃষিজমি, পূর্বাচলের প্লট, টুঙ্গিপাড়ায় জমি ও ভবন, গাড়ি, সোনা এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য উল্লেখ ছিল। তবে হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বাইরে আরও সম্পদ থাকার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধান করছে।

অন্যদিকে, আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্বাচনী হলফনামায় নগদ অর্থ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা, বন্ড-শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত, গাড়ি, ব্যবসার মূলধন, কৃষিজমি, অকৃষিজমি এবং বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য উল্লেখ ছিল।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি সরাসরি সম্পদ হস্তান্তরের মতো নয়। প্রথমে আদালতের বাজেয়াপ্তের আদেশ কার্যকর করতে হবে। এরপর কোন সরকারি সংস্থা সম্পদ শনাক্ত, নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনে বিক্রি করবে এবং সেই অর্থ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে—তা নির্ধারণ করতে হবে।

প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী জানিয়েছেন, বিচারাধীন মামলাগুলোর চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে আদালতের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা চাওয়া হচ্ছে। কোনো আসামির অপরাধ প্রমাণিত হলে এবং রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হলে, কীভাবে সেই আদেশ বাস্তবায়ন করা হবে—রায়েই যেন তার বিস্তারিত নির্দেশনা থাকে, সে বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে।

ফলে শেখ হাসিনাসহ দণ্ডিতদের সম্পদ শহীদ পরিবারের জন্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বণ্টনের নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরই তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে