ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন পাতার চুক্তিপত্রে এক লাখ টাকায় শিশু, বাবার হাতে আইফোন!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০১ ১১:০৪:১৪
তিন পাতার চুক্তিপত্রে এক লাখ টাকায় শিশু, বাবার হাতে আইফোন!

নিজস্ব প্রতিবেদক: আইফোন কেনার জন্য নিজের দেড় বছরের শিশুকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিশুটিকে দেওয়ার বিষয়ে তিন পাতার একটি চুক্তিপত্র করা হয় এবং পরে ওই টাকা দিয়ে একটি আইফোন ১৩ প্রো-ম্যাক্স কেনেন শিশুটির বাবা মো. মারুফ মুন্সি।

অভিযুক্ত মারুফ মুন্সি ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান চালায় পুলিশ। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় এবং তার বাবাকে আটক করা হয়।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি তিন পাতার চুক্তিপত্রও পাওয়া গেছে। এতে প্রথম পক্ষ হিসেবে মো. মারুফ (২২) এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে মো. ইমরান (২৮)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিপত্রে মারুফের দেড় বছরের শিশু জাহিদুল ইসলাম মুসাকে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ‘দত্তক’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, শিশুটির জন্ম ২০২৫ সালের ১১ মে। সেখানে শিশুটির মা ‘অবাধ্য হয়ে’ অজানার উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ায় এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় শিশুটিকে লালন-পালন ও সেবা-যত্ন করা বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে দত্তক দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

চুক্তিপত্রে আরও বলা হয়েছে, দলিলের মাধ্যমে শিশুকে দেওয়ার পর প্রথম পক্ষ বা তার উত্তরাধিকারীরা ভবিষ্যতে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে কোনো দাবি করতে পারবেন না। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো দাবি উঠলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম পক্ষ সুস্থ মস্তিষ্কে এবং কারও প্ররোচনা ছাড়া স্বেচ্ছায় চুক্তিটি করেছেন বলেও এতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে শিশুটিকে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাবা মো. মারুফ মুন্সি। তার দাবি, তিনি সন্তান বিক্রি করেননি; বরং শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য অন্য একটি পরিবারের কাছে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মারুফ বলেন, যাদের কাছে সন্তানকে দেওয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে তার সন্তান বিক্রির কোনো চুক্তি হয়নি। তবে একটি কাগজে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন এবং সেখানে টাকার বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলে স্বীকার করেন।

মারুফের দাবি, চুক্তিপত্রে এক লাখ টাকা উল্লেখ থাকলেও তিনি ওই পরিমাণ অর্থ নেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। নিজের কিছু দেনা থাকায় জরুরি ভিত্তিতে তা পরিশোধের প্রয়োজন ছিল বলে জানান তিনি। কিছুদিন পর সন্তানকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেও দাবি করেন মারুফ।

আইফোন কেনার বিষয়ে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গে মারুফের বক্তব্য ভিন্ন হলেও স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে দেওয়ার পর পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি একটি আইফোন ১৩ প্রো-ম্যাক্স কেনেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে। ওই দিন মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে ছেলে মুসাকে ‘ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার’ কথা বলে বের হন। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাবা-ছেলে বাড়িতে না ফেরায় স্বজনরা তাদের খোঁজ শুরু করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, মারুফ তার ছেলে মুসাকে আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে নিয়ে গেছেন।

পরিবারের সদস্যরা আরও জানতে পারেন, শিশুটিকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ইমরানের কাছে দেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে মারুফ একটি আইফোন কিনেছেন। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। শিশুকে অর্থের বিনিময়ে দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত অভিযান শুরু করে পুলিশ। রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় শিশুটির বাবা মারুফ মুন্সিকে আটক করা হয়। পরে ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে রাত ১০টার দিকে শিশু মুসাকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের পর তাকে তার দাদা-দাদির জিম্মায় দেওয়া হয়।

শিশুটিকে উদ্ধারের পর তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদ হাসান এ বিষয়ে এগিয়ে এসেছেন। শিশুটির নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

তবে শিশুটিকে আসলে কী উদ্দেশ্যে অন্যের কাছে দেওয়া হয়েছিল, চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা এক লাখ টাকা আদৌ লেনদেন হয়েছিল কি না এবং শিশুটির বাবার বক্তব্যের সঙ্গে চুক্তিপত্রের তথ্যের কতটা মিল রয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা। একই সঙ্গে শিশুটির আইনগত অভিভাবকত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একটি শিশুকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে দেওয়ার অভিযোগ এবং এ বিষয়ে লিখিত চুক্তিপত্রের অস্তিত্ব থাকায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ ও প্রশাসনের পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে