ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

সুদ ছাড়াই ৫ হাজার টাকা ঋণ! বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ

২০২৬ আগস্ট ০৯ ১১:৫১:৪০
সুদ ছাড়াই ৫ হাজার টাকা ঋণ! বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: সংসারের ছোটখাটো জরুরি খরচ মেটাতে হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় হাতে পর্যাপ্ত নগদ থাকে না। বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা মোবাইল ফোনের বিল পরিশোধ অথবা প্রয়োজনীয় রিচার্জ করতে গিয়ে অনেকে পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার করেন। এবার এমন ছোট অঙ্কের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণের সুযোগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ঋণ নেওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ ঋণের ওপর কোনো সুদ নেওয়া হবে না। তবে ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত হারে সেবামূল্য নেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ উদ্যোগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত নীতিমালা জারি করা হবে।

দেশে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন দ্রুত বাড়লেও দৈনন্দিন ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে হাতে টাকা না থাকলে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ বা মোবাইল রিচার্জ অনেকের জন্য সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পিত এই ব্যবস্থা মূলত সেই জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য। অর্থাৎ হাতে নগদ অর্থ না থাকলেও ডিজিটাল মাধ্যমে অল্প পরিমাণ টাকা ধার নিয়ে প্রয়োজনীয় বিল বা রিচার্জ করা যাবে।

এটি বড় অঙ্কের ভোগ্যঋণ নয়। বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ও তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে এ সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খসড়া নীতিমালায় ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সেবামূল্যও নির্ধারিত থাকবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণে সর্বোচ্চ ৫ টাকা, ২৫১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ১০ টাকা এবং ৫০১ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ১৫ টাকা সেবামূল্য নেওয়া যাবে।

এ ছাড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা, ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ৩৫ টাকা এবং ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা সেবামূল্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

অর্থাৎ কোনো গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ঋণ নিলে ৩০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। অনুমোদিত সেবামূল্যের বাইরে সুদ, জরিমানা, প্রসেসিং ফি বা অন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রাহক চাইলে নির্ধারিত ৩০ দিনের আগেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো আগাম পরিশোধ ফি নিতে পারবে না।

এর ফলে স্বল্পমেয়াদি এই ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ কম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ঋণ নিতে গ্রাহককে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আবেদন, পরিচয় যাচাই, ঋণ অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং পরিশোধ—পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কাগজে স্বাক্ষরের পরিবর্তে গ্রাহকের বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই ও ডিজিটাল সম্মতি নেওয়া হবে। এতে ছোট অঙ্কের ঋণ পেতে সময় ও কাগজপত্রের ঝামেলা কমবে।

মাসের শেষ দিকে হাতে টাকা নেই, অথচ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের শেষ সময় চলে এসেছে—এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত ডিজিটাল ঋণ কাজে আসতে পারে। একইভাবে মোবাইল ফোনে জরুরি রিচার্জ বা অন্য কোনো ছোটখাটো প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেও এ সুবিধা ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য অল্প সময়ের আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার একটি বিকল্প তৈরি হতে পারে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছোট অঙ্কের ঋণ নেওয়া যাদের জন্য সময়সাপেক্ষ বা কঠিন, তাদের জন্যও এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ ধরনের ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঋণ নেওয়া ও পরিশোধ—দুই প্রক্রিয়াই ডিজিটাল হওয়ায় একজন গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড তৈরি হবে। সময়মতো ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ভবিষ্যতে গ্রাহকের আর্থিক আচরণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

তবে ক্ষুদ্র ঋণ সহজলভ্য হলে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। একজন গ্রাহক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা বারবার ঋণ নিলে ছোট অঙ্কের দায়ও একসময় বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।

একই সময়ে একাধিক ডিজিটাল ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা, আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং অন্য কোনো ঋণ রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি গ্রাহককে ঋণের মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, সেবামূল্য, পরিশোধের সময়সীমা এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়াও জরুরি।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু অনেক মানুষের জন্য প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছোট অঙ্কের ঋণ পাওয়া এখনো সহজ নয়। অল্প টাকার জন্য ঋণ আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়াও অনেক সময় তুলনামূলক জটিল হয়ে পড়ে।

সেই জায়গায় ৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার এই ক্ষুদ্র ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ঋণের অঙ্ক ছোট, মেয়াদ ৩০ দিন এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল হওয়ায় জরুরি সময়ে গ্রাহক দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

তবে প্রস্তাবিত এই ঋণসুবিধা এখনো চালু হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে খসড়া নীতিমালা নিয়ে মতামত নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা করার পর চূড়ান্ত নীতিমালা জারি করা হবে।

চূড়ান্ত নীতিমালায় কারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন, একজন গ্রাহক কতবার ঋণ নিতে পারবেন, ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি কী হবে, গ্রাহকের তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং ঋণ খেলাপি হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সবকিছু যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ছোট ও জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে এটি একটি কার্যকর ডিজিটাল সেবা হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নগদের ওপর নির্ভরতা কমানো, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং আর্থিক সেবার আওতা আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রেও উদ্যোগটি ভূমিকা রাখতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে