ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬

ভারতকে ‘৭ নম্বর বিপদ সংকেত’ দেখাল ঢাকা

২০২৬ আগস্ট ০৭ ১৮:৩৪:১১
ভারতকে ‘৭ নম্বর বিপদ সংকেত’ দেখাল ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতিতে ব্যবহৃত কঠোর শব্দচয়ন ও ভাষার তীব্রতা বিশ্লেষণ করে ঢাকার অবস্থানকে ভারতের প্রতি ‘৭ নম্বর কূটনৈতিক বিপদ সংকেত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী লেখক এবং মার্কিন কংগ্রেসের ২০২৬ সালের আইন প্রণয়ন ও নীতি বিষয়ক ফেলো কাউসার মুমিন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ও ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বক্তব্যকে সাধারণ কূটনৈতিক আপত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কাউসার মুমিনের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে শেখ হাসিনা এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক ও নৈতিক নিন্দার অত্যন্ত উচ্চ মাত্রা প্রকাশ করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বক্তব্য রুটিন কূটনৈতিক আপত্তির সীমা ছাড়িয়ে গুরুতর অভিযোগ, জবাবদিহিতা, সার্বভৌমত্ব এবং সম্ভাব্য বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিষয় সামনে এনেছে।

তিনি বলেন, কূটনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের সরাসরি অর্থের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক বার্তাও বিবেচনায় নিতে হয়। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জসোয়ালের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার সুবিধার্থে বাংলাদেশের বিবৃতির কূটনৈতিক ভাষা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এ বিবৃতির উপযুক্ত শিরোনাম হতে পারে—‘ভারতকে ৭ নম্বর কূটনৈতিক বিপদ সংকেত দেখালো ঢাকা’।

কাউসার মুমিনের বিশ্লেষণে, ‘বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ’ বা ‘বাংলাদেশ ইজ আউটরেজড’—এই শব্দচয়ন কূটনৈতিক অসন্তোষের নয়টি স্তরের মধ্যে সপ্তম স্তরের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। সাধারণত কূটনৈতিক বিবৃতিতে প্রথমে অপেক্ষাকৃত সংযত শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন—‘উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে’ বা ‘নোটস উইথ কনসার্ন’কে প্রথম স্তর, ‘উদ্বেগ প্রকাশ করেছে’ বা ‘এক্সপ্রেসেস কনসার্ন’কে দ্বিতীয় এবং ‘দুঃখ প্রকাশ করেছে’ বা ‘হতাশা ব্যক্ত করেছে’কে তৃতীয় স্তর হিসেবে ধরা হয়।

এরপর ‘দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানানো’ বা ‘স্ট্রংলি অবজেক্টস টু’ চতুর্থ স্তর, ‘নিন্দা করা’ বা ‘কনডেমন্স’ পঞ্চম এবং ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বা বিচলিত’—‘ডিপলি ডিস্টার্বড/ডিপলি ট্রাবল্ড’ ষষ্ঠ স্তরের ভাষা। এর পরেই রয়েছে ‘বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ’—যা সপ্তম স্তরের প্রকাশ। এই শব্দের মাধ্যমে তীব্র অসন্তোষ, গভীর ক্ষোভ এবং গুরুতর আপত্তির বার্তা দেওয়া হয়।

তবে ‘ক্ষুব্ধ’ শব্দটিই কূটনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভাষা নয় বলে মনে করেন কাউসার মুমিন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর পরের অষ্টম স্তরে রয়েছে ‘স্তম্ভিত বা আতঙ্কিত’—‘অ্যাপলড/হরিফাইড’ এবং নবম স্তরে ‘অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন’ বা ‘আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ড’—‘আনঅ্যাকসেপ্টেবল ভায়োলেশন/অ্যাক্ট অব অ্যাগ্রেশন’-এর মতো শব্দ। সাধারণত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, সার্বভৌমত্বে আঘাত কিংবা সরাসরি সংঘাতের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে এ ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হয়।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ’ বলার মাধ্যমে ঢাকা ভারতের প্রতি একটি গুরুতর কূটনৈতিক সতর্কবার্তা দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিষয়টিকে সাধারণ মতপার্থক্য হিসেবে না দেখে জাতীয় মর্যাদা, জাতীয় স্বার্থ ও মৌলিক নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর ইস্যু হিসেবে দেখার বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ক্ষুব্ধ’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখনো সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রেখেছে বলেও তিনি মনে করেন।

কাউসার মুমিন আরও বলেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক দণ্ডিত গণহত্যাকারী’ এবং ‘পলাতক দণ্ডিত গণহত্যার অপরাধী ও গণহত্যাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের শব্দচয়ন কূটনৈতিক ভাষার তীব্রতার অষ্টম থেকে নবম স্তরের কাছাকাছি। কারণ এর মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বৈধতা ও নৈতিক অবস্থানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয়।

বিবৃতিতে ব্যবহৃত ‘মাফিয়া এন্টারপ্রাইজ’, ‘হাসিনা এবং তার অপরাধী সহযোগী গোষ্ঠী’ এবং ‘সে ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’—এ ধরনের শব্দও আলাদা গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ‘ক্রিমিনাল কোহর্ট’ বলতে কোনো অভিযোগে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত সহযোগী গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে ‘হেনচমেন’ শব্দটি এমন অনুগত সহযোগীদের নির্দেশ করে, যারা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশ বাস্তবায়ন করে এবং শব্দটির নেতিবাচক অর্থ রয়েছে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনাকে ‘সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা’ বা ‘অ্যাফ্রন্ট টু সভরেইনটি’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টিও বিশ্লেষণে গুরুত্ব পেয়েছে। কাউসার মুমিনের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বোঝাতে চেয়েছে যে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বিচারিক বিষয়ে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের প্রতিও চ্যালেঞ্জের অভিযোগ এতে উঠে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিষাক্ত বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণাত্মক ভাষা’ বা ‘ভেনোমাস ভিট্রিঅল’ শব্দগুচ্ছ অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন, বিদ্বেষপূর্ণ ও উত্তেজনামূলক বক্তব্য বোঝায়। ‘গুরুতর অপমান’ জাতীয় মর্যাদায় আঘাতের অনুভূতি প্রকাশ করে। আর ‘জঘন্য প্রচেষ্টা’ বা ‘হেইনাস অ্যাটেম্পটস’ শব্দটি ইচ্ছাকৃত ও নৈতিকভাবে নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নির্দেশ করে।

কাউসার মুমিনের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, বাংলাদেশের ব্যবহৃত ভাষা কূটনৈতিক উত্তেজনার সপ্তম স্তর ‘আউটরেজড’ থেকে নবম স্তর ‘গ্রেভ ভায়োলেশন/অ্যাগ্রেশন’-এর মধ্যবর্তী একটি শক্তিশালী অবস্থান নির্দেশ করছে। তাঁর মতে, ভারতের প্রতি ঢাকার মূল বার্তা হলো—বিষয়টি শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে দেখছে না বাংলাদেশ; বরং এর সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং দ্বিপাক্ষিক আস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এই অবস্থানকে ভারত উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক ভাষা আরও কঠোর হতে পারে। ফলে বর্তমান বিবৃতিকে শুধু প্রতিবাদ হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপের আগে দেওয়া একটি গুরুতর সীমারেখা সংকেত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে