ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬

সরকারের কাছে জামায়াতের ৭ প্রশ্ন

২০২৬ আগস্ট ০৮ ১৯:১৮:৪৩
সরকারের কাছে জামায়াতের ৭ প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে যথেষ্ট জনসম্মুখ আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

শনিবার রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সংস্কারের নামে যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য তৈরি হয়, তাহলে তা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

জামায়াতের অভিযোগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের নীতিমালা তৈরির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দলটির প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট খসড়া ও এর পেছনের সমীক্ষা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন।

শামসুল ইসলামের ভাষ্য, জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে প্রতিযোগিতা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে এর সুবিধা সীমিতসংখ্যক বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ জ্বালানি আমদানির জন্য বড় অঙ্কের অর্থায়ন, সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন, টার্মিনাল এবং বন্দর সুবিধার প্রয়োজন হয়। এসব অবকাঠামোগত সক্ষমতা দেশের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।

জামায়াত আরও বলছে, জ্বালানি তেল অন্য সাধারণ পণ্যের মতো নয়। ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানি দেশের কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প ও বিমান চলাচলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে যুদ্ধ, দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকটের সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

বিপিসিকে অদক্ষ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। দলটির দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিসি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুনাফা করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা থাকলে সেটি সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা উচিত, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।

তবে চলতি বছরের জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে—এমন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত কোনো দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করছে দলটি।

জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা কমানোর বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরে জামায়াত। দলটির বক্তব্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একে অপরের বিরোধী নয়। বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট সময় দেওয়া প্রয়োজন।

জ্বালানি বাজারের সম্ভাব্য আকার নিয়েও সতর্ক করেছে জামায়াত। দলটির মতে, দেশে বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থের জ্বালানি তেল কেনাবেচা হয়। এই বাজার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হতে পারে।

এ অবস্থায় সরকারের কাছে একাধিক প্রশ্নও তুলেছে দলটি। বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের খসড়া নীতিমালা সত্যিই তৈরি হচ্ছে কি না, হয়ে থাকলে সেটি প্রকাশ করা হবে কি না, সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের সমীক্ষা রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে—এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে তারা।

জামায়াত একই সঙ্গে জানতে চেয়েছে, ভবিষ্যতে বেসরকারি আমদানিকারকরা বাজারে এলে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দাম কে নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি অতীতে বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি বিপণনের অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তও পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে দলটি।

বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততার পুরোপুরি বিরোধিতা করছে না বলে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির বক্তব্য, বেসরকারি বিনিয়োগ থাকতে পারে, তবে সেটি যেন জবাবদিহিহীনভাবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বাজার তুলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি না করে।

জ্বালানি খাতের সংস্কারের বিকল্প হিসেবে বিপিসির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে স্বাধীন নিরীক্ষা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, আমদানি ব্যয় ও পরিমাণের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

দলটি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ আপাতত স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি খসড়া নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে পর্যাপ্ত সময় ধরে জনমত নেওয়া এবং সংসদীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে, সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। একদিকে সরকার যদি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর যুক্তিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী আশঙ্কা করছে—রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার পরিবর্তে নতুন কোনো বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। ফলে চূড়ান্ত নীতিমালা কীভাবে তৈরি হয় এবং সেখানে জনস্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে