ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

শেয়ারবাজারে বড় সংস্কারের বার্তা দিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

২০২৬ জুলাই ০৯ ১৫:৩৬:২৯
শেয়ারবাজারে বড় সংস্কারের বার্তা দিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বা ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তার ভাষ্য, বিশ্বের কোনো পরিণত শেয়ারবাজারে কার্যক্রমহীন কোম্পানির শেয়ার বাংলাদেশের মতো স্বাভাবিকভাবে লেনদেন হয় না। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেলসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ারবাজার তদারকির ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এতদিন কোনো শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা হলেও ব্যবস্থা নিতে ডিএসইকে বিএসইসির অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এতে অনিয়ম ঠেকাতে বিলম্ব হতো। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে ডিএসইকে তাৎক্ষণিক বা রিয়েল-টাইম পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণের ক্ষমতাও স্টক এক্সচেঞ্জের হাতে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, বাজারকে আরও কার্যকর করতে এ ধরনের ডিরেগুলেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দায়িত্ব গ্রহণের পেছনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাসুদ খান বলেন, বিএসইসি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে দায়িত্ব পালনকারীরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এ কারণে প্রথমে তিনি দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলেন না। পরে সরকার শেয়ারবাজার সংস্কারে আন্তরিক এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দেওয়ায় পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিনি জানান, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় তিনি পরিকল্পনাভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসী। তার ভাষায়, একটি কাজের সফল বাস্তবায়নের জন্য অধিকাংশ সময় পরিকল্পনায় ব্যয় করা প্রয়োজন। বিএসইসিতে যোগদানের আগেই তিনি প্রায় তিন মাস দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা করেছেন।

বাজারের গভীরতা বাড়াতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে ভালো কোম্পানি নির্বাচন বা আর্থিক বিশ্লেষণ করা সহজ নয়। তাই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে দেশে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার বা আর্থিক পরামর্শক সনদ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, মার্জিন ঋণ বিধিমালা এবং পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের কাজও এগিয়ে চলছে।

আইপিও প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সময়োপযোগী করার পরিকল্পনার কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বর্তমানে একটি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র জমা দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যাংকঋণ তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারায়। এই বাধা দূর করতে আইপিও প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনা হবে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে ইউনিলিভার ও ইনসেপটার মতো বড় ও সুশাসিত কোম্পানিকে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ দেওয়া হবে। বর্তমানে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ২৫ শতাংশ শেয়ার অফলোড করে এই সুবিধা পায়। নতুন নীতিমালায় সব ধরনের কোম্পানি মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ পাবে।

মার্জিন ঋণ বিধিমালাও সহজ করা হচ্ছে বলে জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, বিদ্যমান বিধিমালায় এত বেশি শর্ত রয়েছে যে বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন ঋণ গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সংশোধিত বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের পর মার্জিন ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে।

বিতর্কিত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমালোচনা থাকলেও বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের তালিকাচ্যুতি ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তি টি+১ পদ্ধতিতে চালুর কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে কমিশনের আরোপ করা জরিমানা ও শাস্তির বড় অংশই আদালতে আটকে যায়। তিনি জানান, আগের কমিশন প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। এই বাস্তবতায় বিশেষ বেঞ্চ গঠন এবং শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বন্ড বাজারকে আরও সক্রিয় করতে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডের পরিবর্তে মূল মার্কেটে বন্ড তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মাসুদ খান। পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজারে ডেরিভেটিভস পণ্য চালুর কাজও এগিয়ে চলছে।

ডিএসইর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, নিয়োগ ও চাকরি থেকে অব্যাহতির বিষয়টি সম্পূর্ণ ডিএসইর নিজস্ব প্রশাসনিক এখতিয়ার। এ বিষয়ে কমিশনের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিএসইসি থেকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের বিষয়ে চলতি মাসের মধ্যেই একটি ইতিবাচক সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে