ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

ব্যাংকে অলস অর্থ ছাড়াল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা

২০২৬ জুলাই ০৭ ২১:৫৭:৫০
ব্যাংকে অলস অর্থ ছাড়াল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত বা অলস অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এখন ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণখেলাপির লাগামহীন বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন ঋণ বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ২ কোটি টাকা। ছয় মাস পর ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকায়। এরপর চলতি বছরের মে মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য আরও বেড়ে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে অলস অর্থ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদের পরিমাণ ৭ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ বা ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি রয়েছে অবাধ সরকারি অনুমোদিত সিকিউরিটিজ—মূলত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে। নগদ অর্থ অলসভাবে ফেলে না রেখে নিশ্চিত আয়ের জন্য এসব নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ দিয়ে খেলাপির ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ অনেক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক। এসব সিকিউরিটিজ থেকে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যায় এবং ঋণখেলাপির ঝুঁকিও থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এক বছর আগে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিলে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগে। তাদের মতে, একদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ জমে থাকা এবং অন্যদিকে বাস্তব অর্থনীতিতে ঋণের সংকট তৈরি হওয়া আর্থিক শক্তিমত্তার নয়; বরং এটি ব্যাংকিং খাতের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অনীহার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি খেলাপি, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ বলে মনে করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, প্রায় ২০টি ব্যাংক কার্যত নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও কঠোর যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন ঋণ অনুমোদন করছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালের মুদ্রানীতি বিবৃতিতেও উদ্বৃত্ত তারল্য বৃদ্ধির কারণ তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য সব ব্যাংকে সমানভাবে বণ্টিত নয়। সুশাসনসম্পন্ন কয়েকটি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ জমা থাকলেও অন্যদিকে কিছু ব্যাংক এখনও তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল চাহিদা, আমানতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ কার্যক্রমের মন্থরগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত বা অলস তারল্যের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে