ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

বিদেশিদের লেনদেন বেড়েছে, তবুও বেড়েছে শেয়ার বিক্রির চাপ

২০২৬ জুলাই ০৬ ২২:১৭:০৭
বিদেশিদের লেনদেন বেড়েছে, তবুও বেড়েছে শেয়ার বিক্রির চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় তাদের লেনদেন প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে লেনদেন বাড়লেও বাজারে বিদেশি মূলধনের নিট বহিঃপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ, তারা যত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তার চেয়ে বেশি অর্থ শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে তুলে নিয়েছেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে দেখা গিয়েছিল।

একই সময়ে দেশের শেয়ারবাজারের মোট লেনদেনও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৪৩ কোটি ৯ লাখ টাকায়। তবে এই সময়জুড়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশিরভাগ সময়ই নিট বিক্রেতা হিসেবে অবস্থান করেছেন।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় পরিসরে শেয়ার বিক্রি করেন। পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও সেই ধারা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

পরবর্তীতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হলে আবারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় তারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এশীয় বাজার থেকে অর্থ তুলে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত উন্নত দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেন।

ডিএসইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অর্থবছরজুড়েই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট বিক্রেতা ছিলেন। বিশেষ করে জুন মাসে বিক্রির চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু সময় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর সেই ইতিবাচক প্রবণতা থেমে যায়।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন বেড়েছে ঠিকই, তবে এখনো তাদের বিক্রির পরিমাণ কেনার চেয়ে বেশি। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিক্রির চাপ কিছুটা কমেছে।

তার মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে এলে তাদের অংশগ্রহণ আবারও বাড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) এবং এর হিসাব পদ্ধতি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম বড় বাধা। বিষয়টি নিয়ে ডিবিএ একাধিকবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেছে। নতুন কমিশন কার্যকর উদ্যোগ নিলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ বিভিন্ন এশীয় বাজার থেকেও বিদেশি তহবিল উন্নত দেশের বাজারে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে সরে গিয়ে তারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও অধিক নিয়ন্ত্রিত বাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।

এদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মূল্যায়নজনিত উদ্বেগ, দুর্বল করপোরেট আয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ারবাজার থেকেও রেকর্ড ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) প্রত্যাহার করেছেন।

এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকেও বিদেশি মূলধনের বহিঃপ্রবাহ নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ওই মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১৬১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন, বিপরীতে নতুন করে শেয়ার কেনেন মাত্র ৬ কোটি টাকার।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিদেশিদের বিক্রির বড় অংশই ছিল ব্লু-চিপ ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা এখন সীমান্তবর্তী (ফ্রন্টিয়ার) বাজারের তুলনায় অধিক তারল্যসম্পন্ন ও নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে