ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

ইসলামী ধারার ব্যাংকে সর্বোচ্চ চাপ, সিআরএআর নেমেছে ঋণাত্মকে

২০২৬ মে ১৯ ১৭:১৭:৪২
ইসলামী ধারার ব্যাংকে সর্বোচ্চ চাপ, সিআরএআর নেমেছে ঋণাত্মকে

নিজস্ব প্রতিবেদক :দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণের প্রভাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃতফসিল নীতির কারণে আগের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কমেছে এ ঘাটতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। তবে ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা কমে ২০টি ব্যাংকে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়।

ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি বলতে বোঝায়, কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যাওয়া। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ অনুমোদন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বেপরোয়া ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংক খাত বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা।

একই সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।

এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে সংকট সবচেয়ে তীব্র

ব্যাংক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে। সাতটি ইসলামী ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ১২ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকেও চাপ বাড়ছে

বেসরকারি সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

এদিকে বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

পুনঃতফসিলে সাময়িক স্বস্তি

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমে আসার পেছনে পুনঃতফসিল নীতির ভূমিকা রয়েছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণের বিপরীতে কম প্রভিশন রাখতে হয়েছে, যা মূলধনের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এটি মূলত সাময়িক বা কাগুজে সমাধান। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে উন্নত দেখানো গেলেও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

সুশাসনের অভাবে বাড়ছে ঝুঁকি

অর্থনীতিবিদ এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বারবার সরকারি সহায়তা দিতে হচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরই পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে মূলধন সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে এ সংকট নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে