×
ঢাকা, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

এনসিপিতে অস্থিরতা চরমে, পদত্যাগ করছেন শীর্ষ নেত্রীরা

২০২৬ নভেম্বর ০৭ ১০:৫২:০১
এনসিপিতে অস্থিরতা চরমে, পদত্যাগ করছেন শীর্ষ নেত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতবিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতা, দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং নারী নেতৃত্বের অবস্থান নিয়ে দলটির ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে একাধিক শীর্ষ নারী নেত্রীর পদত্যাগ নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম শীর্ষ নেতা সামান্তা শারমিন। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও জোট গঠনের বিরোধিতা করে দলীয় পদ ছাড়েন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন।

নির্বাচনের মাত্র নয় মাসের মাথায় সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের ঘটনায় এনসিপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আবারও সামনে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন সামান্তা শারমিন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বতন্ত্র পরিচয় ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে দলটি ধীরে ধীরে তাদের প্রভাববলয়ে চলে যাচ্ছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করলেও পরবর্তী সময়ে এনসিপি সেই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এতে দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরার পরিবর্তে জামায়াতের সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, এনসিপি চাইলে দেশের রাজনীতিতে সমতা ও অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে দলটি নারীবিরোধী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে আপস করেছে।

দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তার অভিযোগ, গত ২৩ অক্টোবর কোনো কাউন্সিল ছাড়াই শীর্ষ নেতৃত্বের পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এ সময় তাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে অবনমন করে শুধু যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এ প্রক্রিয়াকে অগণতান্ত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি।তার এই অভিযোগ এনসিপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন ও কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

এনসিপির নারী নেতৃত্বের একাধিক পরিচিত মুখের পদত্যাগের ঘটনা নতুন নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক জোট গঠনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দলীয় পদ ছাড়েন ডা. তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীন।

তাদের পদত্যাগের পেছনেও দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোটের কৌশল নিয়ে মতবিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সাম্পান্তা শারমিনের সর্বশেষ পদত্যাগের পর প্রশ্ন উঠেছে, এনসিপি কি প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে? একই সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় নারী নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।তবে পদত্যাগ ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের বিষয়টিকে বড় সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই জামায়াতের সঙ্গে জোট বা সমঝোতা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দলের সবাই একমত হবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে কেউ দলীয় পদ ছেড়ে দিলে বা দলত্যাগ করলে সেটিকে অস্বাভাবিক মনে করার সুযোগ নেই।

কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং যেসব পদ কার্যকরভাবে কাজ করছিল না, সেগুলো সচল করতেই আহ্বায়ক কমিটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কাউন্সিল আয়োজনের মাধ্যমে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দলটির জামায়াতিকরণ হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নাকচ করেছেন।

তার দাবি, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতা থাকলেও সেটি মূলত সংস্কার ও বিচারের দাবিতে কৌশলগত ঐক্যের অংশ। বিভিন্ন নীতি ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এনসিপি সংসদে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখেছে।

নারী নেতৃত্বের সংকটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির বহু নারী নেতা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। কয়েকজন পরিচিত নেত্রীর পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো দলে নারী নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়।

একাধিক শীর্ষ নারী নেত্রীর পদত্যাগের ঘটনায় এনসিপির রাজনৈতিক কৌশল, সাংগঠনিক গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি দলটির ভেতরে কতটা গ্রহণযোগ্য, নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা কতটা নিশ্চিত এবং আগামী কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে—এসব বিষয় এখন আলোচনায় রয়েছে।

এনসিপির নেতৃত্ব অবশ্য বলছে, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পদত্যাগী নেত্রীদের অভিযোগ এবং বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্যের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে