×
ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

৭ নভেম্বর: যে ঘটনায় বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১০:৫৪:৫৫
৭ নভেম্বর: যে ঘটনায় বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

বিশেষ প্রতিবেদক: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও মোড় পরিবর্তনকারী দিন। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দিনটির মূল্যায়ন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও তীব্র মেরুকরণ ও বিতর্ক বিদ্যমান। ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ ছিল না; বরং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ভূরাজনীতি, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ‘অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি’ নিয়ে অসন্তোষ এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনের মতো একের পর এক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছিল এই পটভূমি।তিন দলের তিন রকম বয়ান

৭ নভেম্বরের ঘটনা নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে:

আওয়ামী লীগের অবস্থান: দলটির মতে, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি ও সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের চক্রান্ত, যার মধ্য দিয়ে ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়।

বিএনপির দাবি: তাদের মতে, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী ছিলেন। ৭ নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লবের’ মাধ্যমে সাধারণ সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

জাসদের ব্যাখ্যা: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) দাবি করে, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল এবং তিনিই জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের পরিণতি ঘটে এক মর্মান্তিক দ্বন্দ্বে।

সিআইএ নথি: ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় অভিযানের প্রস্তুতি

সম্প্রতি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-র অবমুক্ত করা এক গোপন নথিতে উঠে এসেছে তৎকালীন চাঞ্চল্যকর এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

নথির তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ১০টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান পরিচালনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি কোনো যুদ্ধাবস্থা না থাকা সত্ত্বেও সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক মহড়া ও আক্রমণের প্রস্তুতি কেবল একটি চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শগত কারণে অচিরেই বিভক্তি তৈরি হয়:

ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার একটি অংশ দল থেকে বেরিয়ে গঠন করে ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ (জাসদ)।

নকশাল ও চীনপন্থী বিভিন্ন বাম ধারার দল বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও তার প্রচলিত শাসনব্যবস্থাকে মেনে নেয়নি।

অন্যদিকে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী অংশটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট: ‘অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি’ ও বৈষম্য

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে তীব্র অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতার (সিনিয়রিটি) নিয়ম:

মুক্তিযোদ্ধা বনাম প্রত্যাগত দ্বন্দ্ব: মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মাত্র ৬৭ জন বাঙালি কর্মকর্তা। অন্যদিকে, ১৯৭৩ সালের সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে আসেন প্রায় ১,০০০ এর বেশি কর্মকর্তা—যা তৎকালীন সেনাবাহিনীর মোট অফিসারের প্রায় ৯৯ শতাংশ।

দুই বছরের অতিরিক্ত জ্যেষ্ঠতা: স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দুই বছরের ‘অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি’ (পূর্ববর্তী জ্যেষ্ঠতা) প্রদান করে। এর ফলে অনেক জুনিয়র মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা রাতারাতি পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা তাদের বহু সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপরে স্থান পান।

জ্যেষ্ঠদের ক্ষোভ: ১৯৫৫ ব্যাচের কর্মকর্তা হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ, ১৯৫৬ ব্যাচের কাজী গোলাম দস্তগীর, ১৯৫৭ ব্যাচের মোস্তাফিজুর রহমান—এঁরা ফিরে এসে দেখেন তাঁদের জুনিয়ররা তাঁদের চেয়ে অনেক সিনিয়র হয়ে গেছেন। এমনকি মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ ও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁদের ব্যাচমেট হয়েও শীর্ষ পদে আসীন হন, অথচ এরশাদকে কোনো পদোন্নতি ছাড়াই পুরনো পদে রাখা হয়।

খালেদ মোশাররফের জটিলতা: মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও এই নীতিমালার অদ্ভুত মারপ্যাঁচে খালেদ মোশাররফের ক্ষেত্রে কার্যকর পদোন্নতি বিলম্বিত হয়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়।

মেজর মঞ্জুর ও শওকত আলীর পদায়ন: মেজর মঞ্জুর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও তাঁকে পাকিস্তান-ফেরত কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাঁর চেয়ে জুনিয়রদের দেশে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে ভারতের দূতাবাসে সামরিক এটাশে হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন ও সেনাবাহিনীর ক্ষোভ

১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে গঠিত হয় ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’।

মূলত মুজিব বাহিনী ও ছাত্রলীগের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৮ হাজার থেকে দ্রুত ৩০ হাজারে উন্নীত করা হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেখানে পাকিস্তান আমলের ভাঙাচোরা অস্ত্র নিয়ে চলছিলেন, সেখানে রক্ষীবাহিনীকে ভারত থেকে আনা আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, যানবাহন ও উদার বাজেট দেওয়া হয়।

তদুপরি, ১৯৭৩ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীকে যে কাউকে গ্রেফতার ও তল্লাশির অবাধ ক্ষমতা এবং যেকোনো ধরনের আইনি জবাবদিহিতা থেকে পূর্ণ ‘দায়মুক্তি’ (ইনডেমনিটি) দেওয়া হয়। যা সামরিক বাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মনে তীব্র বঞ্চনা ও আক্রোশের জন্ম দেয়।

অস্ত্র হস্তান্তর ও মেজর জলিলের প্রতিবাদ

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পণ করার পর তাদের বিশাল অস্ত্রের সম্ভার, গোলাবারুদ ও ট্যাংক বাংলাদেশের হাতে না দিয়ে ভারতের সেনাবাহিনী তাদের দেশে নিয়ে যায়। নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর এম এ জলিল এর প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

রাজনৈতিক বিভাজন, সেনাবাহিনীর মধ্যকার তীব্র পদমর্যাদাগত অসন্তোষ, রক্ষীবাহিনীর প্রতি সরকারের অতিরিক্ত পক্ষপাত এবং সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে গোপনে গঠিত ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে ১৯৭৫ সালের শেষভাগে এক মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এই জটিল সংকট ও ক্ষোভের বিস্ফোরণই ১৯৭৫ সালের ৩ ও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নেয়।

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে