×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবার ঋণ ব্যবসায় লোকসানে শেয়ারবাজারের ব্যাংকগুলো

২০২৬ নভেম্বর ০৫ ১৮:৫২:২৮
ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবার ঋণ ব্যবসায় লোকসানে শেয়ারবাজারের ব্যাংকগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসা ঋণ বিতরণ থেকে সুদ আয় এবার বড় ধাক্কা খেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ২৭টি ব্যাংকের সম্মিলিত নিট সুদ আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অন্তত ছয় বছরের মধ্যে এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের বাড়তি চাপের কারণে ব্যাংকগুলোর নিয়মিত আয় সংকুচিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে কম অর্থ সংরক্ষণ ব্যাংকগুলোর মুনাফার চিত্র ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।

ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭টি তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সম্মিলিত নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট সুদ আয় ছিল ইতিবাচক ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ কার্যক্রম থেকে ব্যাংকগুলোর আয়ের চিত্রে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে।

ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলো আমানত সংগ্রহ করে ঋণ বিতরণ এবং সেখান থেকে সুদ আয় করা। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন ঋণ বিতরণে গতি নেই। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণ থেকে নিয়মিত সুদ আয় না আসায় ব্যাংকগুলোর মূল আয়ের উৎস দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণের তুলনায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছেন ব্যাংকাররা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭টি ব্যাংকের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ২০টির নিট সুদ আয় কমেছে। ঋণাত্মক সুদ আয় করা ব্যাংকের সংখ্যা গত বছরের ছয়টি থেকে বেড়ে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে একই সময়ে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত নিট বিনিয়োগ আয় ২১ শতাংশ বেড়ে ৩২ হাজার ৬২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিনিয়োগ আয়ের বড় অংশ এসেছে সরকারি বন্ড থেকে।

সাত ব্যাংকের লোকসান ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি

ব্যাংকগুলোর মুনাফার চিত্রেও বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে। প্রথম নয় মাসে ২৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টি মুনাফা করেছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাকি সাতটি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসান ছাড়িয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা।

লোকসানের বড় অংশ রয়েছে খেলাপি ঋণের চাপে থাকা কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। এসব ব্যাংকের অনেক ঋণ আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মুনাফার তালিকায় শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি লোকসান করা পাঁচ ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণের পরিবর্তে পুরোনো ঋণ এবং সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় করছে। ঋণ বিতরণের গতি কমে যাওয়া এবং বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ থেকে সুদ না পাওয়ায় সম্মিলিত নিট সুদ আয় ঋণাত্মক হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে বিআইবিএমের অধ্যাপক আহসান হাবিবের মতে, শুধু ঋণের চাহিদা কমে যাওয়াই এ সংকটের কারণ নয়। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজেরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ স্বীকারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক ছাড় বা শিথিলতার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে আরও অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, এ দুটি বিষয় একসঙ্গে ব্যাংক খাতের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

প্রভিশন কমায় মুনাফায় ইতিবাচক চিত্র

ঋণ থেকে সুদ আয় কমলেও তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। এর পেছনে বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থ বা প্রভিশন কমানোর ভূমিকা রয়েছে। প্রথম নয় মাসে ২৭টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন আগের বছরের ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ এ খাতে সংরক্ষণের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

মুনাফা করা ২০টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রভিশন কমেছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে তাদের সম্মিলিত মুনাফা বেড়েছে ২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। প্রভিশন কমানোর প্রভাব বাদ দিয়ে হিসাব করলে এসব ব্যাংকের প্রভিশন-পূর্ব মুনাফা প্রায় ৬ শতাংশ কমে ১৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় নেমেছে। করের বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া এই হিসাব ইঙ্গিত করছে, মূল ব্যবসার আয় বাড়ার পরিবর্তে প্রভিশন কমানোর কারণেই মুনাফার প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে।

প্রভিশন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ৮২৩ কোটি টাকা কমেছে, আর একই সময়ে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা। শীর্ষ পাঁচ মুনাফাকারী ব্যাংকের মধ্যে পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ৬৭৩ কোটি টাকা বাড়লেও প্রভিশন কমেছে ৩৮৭ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থ কমেছে।

তবে বড় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম ব্র্যাক ব্যাংক। প্রভিশন ৮০ শতাংশ বেড়ে ২৬৩ কোটি টাকা হলেও ব্যাংকটির মুনাফা ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নিট সুদ আয় ৪২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা এবং নিট বিনিয়োগ আয় ২২ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা হয়েছে।

অন্যদিকে লোকসানে থাকা সাতটি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে মাত্র ৩৭১ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে, যেখানে তাদের মোট লোকসান ১৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংক মাত্র ১ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক ৪ কোটি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৯ কোটি টাকা প্রভিশন রেখেছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক কোনো প্রভিশনই সংরক্ষণ করেনি।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ায় তাদের প্রভিশনের পরিমাণ কমেছে। প্রাইম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমানও বলেছেন, ঋণের মান উন্নত হওয়া, খেলাপি ঋণ কমা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ ও দুর্বল সম্পদ থেকে নগদ অর্থ আদায় বাড়ায় তাঁদের প্রভিশন কমেছে।

তবে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের আশঙ্কা, কিছু ব্যাংক ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে প্রভিশন কমিয়ে থাকতে পারে। যেসব ব্যাংকের প্রভিশন দ্রুত কমেছে, তাদের মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য কোনো ধরনের ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ করা হয়েছে কি না, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

বিআইবিএমের অধ্যাপক আহসান হাবিব ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রক ছাড় দেওয়া বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক খাতের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা মিলবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে