×
ঢাকা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

এপেক্স ফুডসের বিনিয়োগ ও পাওনা নিয়ে প্রশ্ন, উচ্চ আদালতে দুই মামলা 

২০২৬ নভেম্বর ০৪ ১৪:১২:৩৫
এপেক্স ফুডসের বিনিয়োগ ও পাওনা নিয়ে প্রশ্ন, উচ্চ আদালতে দুই মামলা 

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি এপেক্স ফুডস লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। এর মধ্যে রয়েছে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা এবং যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনায় বিমা দাবি আদায়সংক্রান্ত মামলা। কোম্পানিটির ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপেক্স ফুডসের মোট বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৫৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৩০ টাকা। অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে পাওনা রয়েছে ২১ কোটি ৬১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৫ টাকা। এর মধ্যে সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস লিমিটেডে ২ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে মামলা চলছে। পাশাপাশি ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৭ টাকার বিমা দাবিও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে বিষয় দুটি বিশেষ গুরুত্ব পেলেও এগুলোর কারণে কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর ওপর দেওয়া নিরীক্ষা মতামত পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ নিরীক্ষক এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের নজরে এনেছেন, তবে এ কারণে শর্তযুক্ত বা বিরূপ মতামত দেননি।২০১৮ সাল থেকে আদালতে আটকে রয়েছে বিনিয়োগসংক্রান্ত বিরোধএপেক্স ফুডসের আর্থিক প্রতিবেদনের ৯ নম্বর টীকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস লিমিটেডে কোম্পানিটির বিনিয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপেক্স ফুডস প্রতিষ্ঠানটির ২ লাখ সাধারণ শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। এ হিসাবে বিনিয়োগের মোট মূল্য ২ কোটি টাকা।

কিন্তু এই বিনিয়োগ নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে আইনি বিরোধ চলছে। বিষয়টি ২০১৮ সালের ১৯১ (এফ) নম্বর দেওয়ানি মামলার আওতায় উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মামলাটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এম মাসুদ রহমান পরিচালনা করছেন।

২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। তবে ওই দিন মামলার কার্যক্রম পরবর্তী শুনানির জন্য মুলতবি করা হয়। পরবর্তী শুনানির তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই বিনিয়োগের পুরো অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

২ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নএপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস লিমিটেডে বিনিয়োগের বিপরীতে মামলা চললেও কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে বিনিয়োগটির মূল্য ২ কোটি টাকাই দেখিয়েছে। আগের হিসাববছরেও একই পরিমাণ বিনিয়োগ দেখানো হয়েছিল।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১৮ সাল থেকে মামলা চলমান থাকলেও বিনিয়োগটির বর্তমান আর্থিক মূল্য, সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি কিংবা মামলা নিষ্পত্তির পর বিনিয়োগের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই।

ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য মামলার প্রকৃতি, বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।মোট বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকাএপেক্স ফুডসের আর্থিক প্রতিবেদনের ৯ নম্বর টীকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৫৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৩০ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৩৭ লাখ ৬৩ হাজার ২১০ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য বেড়েছে ৭০ কোটি ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩২০ টাকা।

বিনিয়োগের বিস্তারিত হিসাবে দেখা যায়, এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেডের ২২ লাখ ৬৩ হাজার ২০০ সাধারণ শেয়ার রয়েছে এপেক্স ফুডসের হাতে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। এসব শেয়ারের ক্রয়মূল্য ২ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

তবে ২০২৬ সালের ৩০ জুন বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এই বিনিয়োগের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯০ কোটি ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৮০ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই বিনিয়োগের বাজারমূল্য ছিল ২০ কোটি ২১ লাখ ৩ হাজার ৭৬০ টাকা।

অর্থাৎ এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের শেয়ারের বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে এপেক্স ফুডসের বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের প্রতিটি শেয়ারের বাজারদর ছিল ৩৯৯ টাকা ৪০ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৯ টাকা ৩০ পয়সা।

ফলে এক বছরে শেয়ারটির বাজারদর বেড়েছে ৩১০ টাকা ১০ পয়সা, যা প্রায় ৩৪৭ দশমিক ২৬ শতাংশ।

তবে এই মূল্যবৃদ্ধি শেয়ার বিক্রি করে অর্জিত মুনাফা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের মূল্যায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানএপেক্স ফুডসের বিনিয়োগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মোট বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ও আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের শেয়ার কেনার খরচ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

এ ছাড়া এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলসের ২ লাখ শেয়ারের ক্রয়মূল্য ২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) কোম্পানিটির বিনিয়োগ রয়েছে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫০ টাকা।

সব মিলিয়ে এসব বিনিয়োগের মোট ক্রয়মূল্য ৪ কোটি ৪২ লাখ ১ হাজার ৪৫০ টাকা।

অথচ ২০২৬ সালের ৩০ জুন বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৫৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৩০ টাকা।

অর্থাৎ মোট ক্রয়মূল্যের তুলনায় বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য ৮৮ কোটি ১২ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা বেশি।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিনিয়োগের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের শেয়ারের বাজারদর বৃদ্ধির কারণে হয়েছে।

ফলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বাজারদরে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে কোম্পানির বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্যেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

সিডিবিএলে বিনিয়োগের মূল্য অপরিবর্তিতএপেক্স ফুডসের বিনিয়োগের আরেকটি অংশ রয়েছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি সিডিবিএলের ৫ লাখ ৭১ হাজার ১৮১টি সাধারণ শেয়ার এবং ৪ লাখ ১৪ হাজার ২৩৬টি বোনাস শেয়ার ধারণ করছে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে ৫৬ হাজার ৫৪৩টি রাইট শেয়ারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

সিডিবিএলে বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য দেখানো হয়েছে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫০ টাকা। আগের বছরও একই পরিমাণ ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিডিবিএলের শেয়ার বাজারে লেনদেনযোগ্য নয়। সে কারণে এই বিনিয়োগ বাজারমূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের শেয়ার বাজারমূল্যে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে একই বিনিয়োগ খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে এর কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।২৯ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বিমা দাবিএপেক্স ফুডসের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বিমা দাবি আদায়ের মামলা।

আর্থিক প্রতিবেদনের ১৪ নম্বর টীকা অনুযায়ী, কোম্পানিটির ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৭ টাকা বিমা দাবি বাবদ পাওনা রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুনও একই পরিমাণ অর্থ পাওনা দেখানো হয়েছিল।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে মজুত পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঘটনায় বিমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। এ জন্য ১৯৯৭ সালে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানির কাছে যথাযথ দাবি দাখিল করা হয়েছিল।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দাবিকৃত অর্থের নিষ্পত্তি হয়নি। বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে বিমা দাবি উত্থাপনের পর প্রায় ২৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও কোম্পানিটি সংশ্লিষ্ট অর্থ আদায় করতে পারেনি।

এত দীর্ঘ সময় ধরে বিমা দাবি অনিষ্পন্ন থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে পুরো ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৭ টাকা পাওনা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রায় তিন দশক ধরে বিচারাধীন থাকা বিমা দাবির অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা কতটুকু এবং এত দীর্ঘ সময় পরও পুরো অর্থ পাওনা হিসেবে দেখানোর যৌক্তিকতা কী।

তবে নিরীক্ষক এই অর্থ অনাদায়ী ঘোষণা করেননি। বরং মামলাটি বিচারাধীন থাকার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের নজরে এনেছেন।

অন্যান্য পাওনা বেড়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকাআর্থিক প্রতিবেদনের ১৪ নম্বর টীকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন এপেক্স ফুডসের অন্যান্য পাওনার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৬১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৫ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭ কোটি ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৮ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে অন্যান্য পাওনা বেড়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৩ হাজার ২৩৭ টাকা, যা প্রায় ২৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।

এই পাওনার সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে নগদ প্রণোদনা বাবদ।

২০২৬ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির নগদ প্রণোদনা বাবদ পাওনা ছিল ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ৩০০ টাকা। আগের বছর এই খাতে পাওনা ছিল ১৩ কোটি ২৪ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে নগদ প্রণোদনা বাবদ পাওনা বেড়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা।

কোম্পানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ প্রণোদনা বাবদ পাওনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে অর্থ পাওয়া যাবে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নগদ প্রণোদনা বাবদ পাওনার মেয়াদ সর্বোচ্চ ছয় মাস।

তবে ১৭ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনার অর্থ ঠিক কবে আদায় হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।সমন্বয়যোগ্য ব্যবসায়িক কর বাবদ ৪৫ লাখ ৮২ হাজার টাকাঅন্যান্য পাওনার মধ্যে সমন্বয়যোগ্য ব্যবসায়িক কর বাবদ ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৯২৬ টাকা দেখিয়েছে এপেক্স ফুডস।

আগের বছরের তুলনামূলক হিসাবে এই খাতে কোনো অর্থ দেখানো হয়নি।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে ২০২৩ সালের আয়কর আইনে আনা পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬৩ ধারার আওতায় অতিরিক্ত পরিশোধিত করকে চলতি বছরে সমন্বয়যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সে অনুযায়ী ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৯২৬ টাকা সমন্বয়যোগ্য ব্যবসায়িক কর হিসেবে আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্থায়ী আমানতের সুদ বাবদ পাওনা ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকাকোম্পানিটির স্থায়ী আমানত বা এফডিআরের সুদ বাবদ পাওনাও বেড়েছে।

২০২৬ সালের ৩০ জুন এ খাতে পাওনা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৯ টাকা। আগের বছর ছিল ২ কোটি ২০ লাখ ৪ হাজার ৬৮৬ টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে এফডিআরের সুদ বাবদ পাওনা বেড়েছে ১৭ লাখ ৩১ হাজার ৮৭৩ টাকা।

কোম্পানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থায়ী আমানতের বিপরীতে প্রাপ্য সুদের হিসাব অনুযায়ী এই অর্থ আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ভবিষ্য তহবিলসংক্রান্ত পাওনা কমেছেঅন্যান্য পাওনার মধ্যে কর্মীদের ভবিষ্য তহবিলের নিয়োগকর্তার অংশের মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থও রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন এই খাতে পাওনা ছিল ১ লাখ ৭৪ টাকা। আগের বছর ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫ টাকা।

ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাওনা কমেছে ৮৪ হাজার ৯৬১ টাকা।

কোম্পানির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন আইন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভবিষ্য তহবিলের নিয়োগকর্তার অংশের মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থের বিপরীতে প্রাপ্য হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।অন্যান্য পাওনার হিসাবে এক টাকার গরমিলআর্থিক প্রতিবেদনের ১৪ নম্বর টীকার সংখ্যাগুলো যোগ করলে আরও একটি ছোট গাণিতিক অসংগতি পাওয়া যায়।

২০২৬ সালের জন্য প্রদর্শিত বিমা দাবি ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৭ টাকা, নগদ প্রণোদনা ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ৩০০ টাকা, সমন্বয়যোগ্য ব্যবসায়িক কর ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৯২৬ টাকা, এফডিআরের সুদ ২ কোটি ৩৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং ভবিষ্য তহবিলসংক্রান্ত পাওনা ১ লাখ ৭৪ টাকা যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ২১ কোটি ৬১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৬ টাকা।

কিন্তু প্রতিবেদনে মোট দেখানো হয়েছে ২১ কোটি ৬১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ উপখাতগুলোর যোগফলের তুলনায় প্রদর্শিত মোট এক টাকা কম।

এই পার্থক্য অত্যন্ত সামান্য এবং এর কারণে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর সঙ্গে মোটের এই গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে।

বিনিয়োগ ও পাওনার হিসাবে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণএপেক্স ফুডসের নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংযুক্ত আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

প্রথমত, ২০১৮ সাল থেকে এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলসে ২ কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখও প্রতিবেদনে অনির্ধারিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ১৯৯৭ সালে দাখিল করা ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৭ টাকার বিমা দাবি প্রায় ২৯ বছর পরও নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ পুরো অর্থ পাওনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

তৃতীয়ত, কোম্পানির বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্য এক বছরে প্রায় ৭০ কোটি টাকা বেড়েছে। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলসের শেয়ারের বাজারদর বৃদ্ধি। ফলে বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিনিয়োগের মূল্যায়নও সম্পর্কিত।

চতুর্থত, অন্যান্য পাওনার মধ্যে নগদ প্রণোদনা বাবদ ১৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি রয়েছে। এটি মোট অন্যান্য পাওনার প্রায় ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে এই অর্থ আদায়ের সময় ও অগ্রগতি কোম্পানির নগদ প্রবাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, অন্যান্য পাওনার উপখাতগুলোর যোগফল ও প্রদর্শিত মোটের মধ্যে এক টাকার গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে।

নিরীক্ষকের মতামত পরিবর্তন হয়নিউল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এপেক্স ফুডসের নিরীক্ষক বিনিয়োগসংক্রান্ত মামলা ও বিমা দাবি আদায়ের মামলাকে বিশেষ গুরুত্বারোপের আওতায় এনেছেন। তবে এসব বিষয়ের কারণে নিরীক্ষা মতামত পরিবর্তন করেননি।

অর্থাৎ প্রতিবেদনে মামলা দুটি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করা হলেও সংশ্লিষ্ট অর্থের পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতি হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

তবে দীর্ঘদিনের বিচারাধীন বিনিয়োগ ও বিমা দাবি, বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগের হিসাবভুক্ত মূল্যে বড় পরিবর্তন এবং বিপুল পরিমাণ নগদ প্রণোদনা বাবদ পাওনা—এসব বিষয় কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ২৯ বছর ধরে অনিষ্পন্ন বিমা দাবি এবং ২০১৮ সাল থেকে বিচারাধীন বিনিয়োগসংক্রান্ত মামলার বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে কোম্পানির বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয়।

এ অবস্থায় মামলাগুলোর নিষ্পত্তির অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট অর্থের আদায়যোগ্যতা এবং বিনিয়োগের মূল্যায়নসংক্রান্ত তথ্য আরও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা হলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা অধিকতর স্বচ্ছ ধারণা পাবেন।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে