×
ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সরকারি বেতন বাড়িয়ে নতুন ফাঁদে পড়ছে সরকার

২০২৬ নভেম্বর ০২ ১৬:৫০:৫৩
সরকারি বেতন বাড়িয়ে নতুন ফাঁদে পড়ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া পরিশোধে এই অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে।

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ১ নভেম্বর থেকে। তবে বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক সংস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার। নতুন ৫ হাজার কোটি টাকার নিলামসহ অক্টোবর মাসে মোট ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

তবে এই পুরো অর্থকে সরকারের নতুন বা নিট ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ, সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

তুলনামূলকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। আর শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৭ শতাংশের সমান।

এ কারণে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সেই অর্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতের ব্যয় যেন সংকুচিত না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ ১১ বছরে নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি সামনে আসে।

২০২৫ সালে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন পর্যালোচনা শেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশ জমা দেয়। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল।

পরবর্তী সময়ে সরকার কিছু পরিবর্তন এনে ৩১ আগস্ট নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করে। সরকারের হিসাবে, এতে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

১ নভেম্বর থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া শুরু হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অক্টোবরের বেতনের পাশাপাশি জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বর্ধিত বেতনের বকেয়াও পেয়েছেন। তবে পে-ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ না হওয়ায় সবার ক্ষেত্রে অর্থপ্রদান একই সময়ে সম্পন্ন হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী এবং ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন।

সরকারের আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আগের অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতে। এসব খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। ফলে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।

নতুন বেতন কাঠামোর পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। বেতন সমন্বয় হলে কর্মীদের জীবনমান ও কাজের আগ্রহ বাড়তে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি কমার সম্পর্কের কথা বলেছেন। গত ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আর্থিক অভাব থেকে দুর্নীতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং বেতন বাড়লে সেই প্রবণতা কমার কথা।

তবে শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, তদারকি এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির নথিতে বলা হয়েছে, উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে বেতন বাড়ানো হলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে অর্থবাজারে চাপ সৃষ্টি এবং সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরিও নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারি ব্যয় ও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব পণ্যমূল্যেও পড়তে পারে।

অন্যদিকে সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান এক নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের রয়েছে কি না। তাঁর মতে, রাজস্ব না বাড়লে এই ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে, অন্য খাতের ব্যয় কমাতে অথবা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে হতে পারে।

জাতীয় বেতন কমিশনও বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারের ব্যয় কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ছিল ভর্তুকি কমানো, রপ্তানি খাতের নগদ প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর একীভূত বা ছোট করা।

এ ছাড়া অকার্যকর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো এবং করব্যবস্থায় সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও এর আর্থিক দায় দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাড়তি বেতন দিতে গিয়ে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ কমিয়ে এই ব্যয় মেটানোও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

১ নভেম্বর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন দেওয়া শুরু হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে বেতন ও বকেয়া পরিশোধের অর্থ জোগাতে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আয়োজনের উদ্যোগ সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সামনে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা। তা না হলে বেতন বৃদ্ধির সুফল ধরে রাখার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে।

জাহিদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে