×
ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

জাপানি বিনিয়োগ ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিশেষ জোর প্রধানন্ত্রীর

২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৮:৩৪:০২
জাপানি বিনিয়োগ ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিশেষ জোর প্রধানন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা এবং দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রবাসীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করতে পারেন। তাঁদের উদ্যোগ ও সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আয়োজিত এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। সভায় তিনি জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, জাপান সরকারের কাছে বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন খাতের চাহিদা পূরণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

চার দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীরা স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৯টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ দুই দেশের সরকারপ্রধান তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ঘোষণাও দেওয়া হয়।

দেশের অর্থনীতিতে তরুণদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটির কম হবে না বলে তাঁর ধারণা। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাঁদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো বদলে গেছে। এখন সরকারের কাজ সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তাঁরা বিনিয়োগ করতে পারেন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে বন্ধ হয়ে থাকা প্রায় ৪৬টি মিল-কারখানা পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অবকাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ছাড়া উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র গঠনে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। এ লক্ষ্যে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই ব্যবস্থায় জাপানিসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে। আগামী বছর থেকেই এ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নেও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা এবং প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি শিশু ও নারীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পৃথক বিশেষায়িত ওয়ার্ড স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এদিকে, টোকিওতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই পক্ষ। যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে আরও গতিশীল করার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।

এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা। পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চারটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হলো আধুনিক ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে যে পরিকল্পনাগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল কতটা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে