×
ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংকিং খাত এখন ‘প্রিক্যারিয়াস’, খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৬:৪৫:৫৬
ব্যাংকিং খাত এখন ‘প্রিক্যারিয়াস’, খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে গেছে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততা দুর্বল হয়েছে এবং তারল্য পরিস্থিতিও সব ব্যাংকে একরকম নয়। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ব্যাংকিং খাতের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকেরই ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর দেশে ৫৭টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এর মধ্যে কতগুলো ব্যাংক এখন পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে, সেটিও একটি প্রশ্ন। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অবস্থাও দুর্বল।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রিক্যারিয়াস সিচুয়েশন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাতটি কোনোভাবেই ভালো অবস্থায় নেই।

খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়েছে

দেশের খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটা সময় খেলাপি ঋণ বলতে মূলত সরকারি ব্যাংকগুলোকেই বোঝানো হতো। ২০০৮ সালে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সেই খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আগে ধারণা করা হয়েছিল দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের বেশি। ভবিষ্যতে এই হার আরও বাড়তে পারে।

নীতিগত সহায়তার আওতায় পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি অংশও ভবিষ্যতে আবার খেলাপি হয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

সরকারি সিকিউরিটিতে বাড়ছে ব্যাংকের বিনিয়োগ

ব্যাংকের মূল ব্যবসা ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহ হলেও অনেক ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়ছে বলে জানান মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন ব্যাংকও দেখা গেছে, যাদের ঋণ ও অগ্রিম কমেছে। কিন্তু একই সময়ে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ এবং মুনাফা বেড়েছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে মুনাফা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ব্যবসার স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের মূল ব্যবসা হচ্ছে টাকা দেওয়া এবং টাকা নেওয়া। ফলে নিট সুদ আয় কমে যাওয়া শুধু একটি ব্যাংকের জন্য নয়, পুরো ব্যাংকিং শিল্পের জন্যই অশুভ সংকেত।

তিনি বলেন, সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেলে ব্যাংকগুলোকে মূল ব্যবসা থেকে আয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে আমানত সংগ্রহ এবং তহবিলের ব্যয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আইএফআরএস-৯ এ বাড়তে পারে প্রভিশন

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করেন মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে পুনঃতফসিল করা ঋণগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি সামনে চলে আসতে পারে। তখন এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতে পারে।

একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো যখন ঋণের বিপরীতে জামানত খুঁজতে শুরু করবে, তখন তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ব্যাংকিং খাতের সংকট সিস্টেমিক

বর্তমান ব্যাংকিং সংকটকে শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে না দেখে পুরো ব্যবস্থার বা ‘সিস্টেমিক ইস্যু’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, একটি ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ভালো ও দুর্বল ব্যাংককে আলাদাভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন থাকলেও এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পড়ে।

ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান, তারল্য এবং মূলধনের প্রকৃত অবস্থা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু মূলধন দিলেই একটি দুর্বল ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে না। দুর্বল ব্যাংককে কেবল মূলধন দিয়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা হলে এবং এর ৩০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেলে ১৮ হাজার কোটি টাকা কার্যত আটকে যায়। এই অর্থ ফেরত না এলে আমানতকারীদের দায় পরিশোধেও ব্যাংকটি সমস্যায় পড়তে পারে।

তিনি বলেন, আজ ৫০ হাজার কোটি টাকা দিলেই পরদিন ব্যাংক ঠিক হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ব্যাংকের মূলধনের অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতি স্বীকার করে মূলধন সমন্বয় করতে হবে।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ নিয়ে প্রশ্ন

পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ নিয়েও কথা বলেন মাহবুবুর রহমান। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত একটি শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংক একীভূত করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সমন্বয় বা ‘সিনার্জি’ তৈরির সুযোগ থাকে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে আরেকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, একীভূতকরণের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিচালন ব্যয় ও অদক্ষতা কমানো। কিন্তু একীভূত হওয়ার পরও যদি পাশাপাশি শাখা, জনবল ও পরিচালন কাঠামো বহাল থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ব্যাংকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। তবে কর্মী ছাঁটাই বা প্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে দক্ষতা বাড়াতে হবে। তবে খরচ কমানোর অজুহাতে ইচ্ছামতো কর্মী ছাঁটাই বা প্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকের মোট ব্যয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভাড়া, বেতন, মজুরি, বিমাসহ ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় খরচ। এসব ব্যয় পুরোপুরি কমিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোতে নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন কমে আসতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রিফাইন্যান্স স্কিমে অনাগ্রহ ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নয়’

অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা ও পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার না করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’ তৈরি হয়েছে কি না।

জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি কোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নয়। বরং বাস্তব ও পরিচালনাগত সমস্যার কারণে অনেক পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো নীতিগত সহায়তা বা পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প চালু করলে এর সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত থাকে। কোনো গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংককে তার আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি বিবেচনা করতে হয়। গ্রাহকের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বা শর্ত পূরণের সামর্থ্য না থাকলে ব্যাংক চাইলেও ঋণ দিতে পারে না।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পে গ্রাহকের ৩০ শতাংশ নিজস্ব মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক থাকলে সেই মূলধন না থাকায় ব্যাংকের পক্ষে ঋণ দেওয়া সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, কিছু পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পে ভালো অর্থছাড় হয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পে কোনো অর্থছাড় হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকগুলো অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছে।

মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তাকে সরাসরি কোনো নির্দেশ দেয়, তাহলে তা পালন করতেই হবে। ফলে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পে ব্যাংকের অনাগ্রহকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে কোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সুশাসন ছাড়া ব্যাংকিং সংকটের সমাধান সম্ভব নয়

ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটাতে সুশাসনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ব্যাংকের ব্যালান্সশিট সঠিকভাবে মূল্যায়ন, যথাযথ প্রভিশন সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়ন এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা, ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা অনিয়মের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে না পারলে সংস্কারের উদ্যোগও টেকসই হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো এখন আর অদৃশ্য নয়। সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিকভাবে ব্যালান্সশিট মূল্যায়ন, লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্গঠন, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে