×
ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাসিনার দেশে না ফিরলে রাজনীতিতে নতুন হিসাব

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৫:৩৪:৩৬
৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাসিনার দেশে না ফিরলে রাজনীতিতে নতুন হিসাব

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের অবস্থান থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রায় দুই বছর ধরে ভারতের বাইরে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এখন তার দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে সামনে এসেছে নতুন প্রশ্ন—তিনি যদি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে না ফেরেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ৩১ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ফেরার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এলেও, এটি এমন কোনো সরকারি সময়সীমা নয় যার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হবে। শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তার মুখপাত্রও ৩১ ডিসেম্বরের আগে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ তখনও ঠিক হয়নি।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত চলে যান। এরপর তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় এবং ২০২৫ সালে অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।

এই পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জুলাই ২০২৬-এ রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি তার জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে—তবু তিনি ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

পরবর্তী সময়েও তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন। আগস্টে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বলেন, গ্রেপ্তার বা কারাবাসের ঝুঁকি থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান। ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে।

আওয়ামী লীগ বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও আইনি চাপে রয়েছে, তার মধ্যে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি দলটির ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তিনি দেশে না ফিরলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।

তবে এটিকে সরাসরি ‘দল ভেঙে যাবে’ বা ‘আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে’—এমন সিদ্ধান্তে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং বাস্তবতা হবে, দলটি কীভাবে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনা করে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া থেমে যাবে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং তিনি বিদেশে থাকলে তাকে দেশে ফেরানোর জন্য প্রত্যর্পণ বা অন্যান্য আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের অবস্থানে পরিবর্তন হয়নি।

অর্থাৎ শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে স্বেচ্ছায় না ফিরলে বিষয়টি আরও বেশি করে ঢাকা-নয়াদিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্ক ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ইতোমধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ তাকে ফেরত চেয়ে আসছে, আর ভারত জানিয়েছে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ফলে তিনি ডিসেম্বরেও ভারতে থেকে গেলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার মধ্যে শেখ হাসিনার অবস্থান একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবেই থেকে যেতে পারে।অন্যদিকে, শেখ হাসিনা যদি সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হতে পারে।

তার দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, আদালতে কী প্রক্রিয়া হবে, তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা নিজেই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান রায় ও আইনি অবস্থানের কারণে প্রত্যাবর্তনের পর পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হতে পারে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের জন্য একদিকে সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, অন্যদিকে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

তিনি দেশে ফিরলে তার সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে তার বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়াও তীব্র হতে পারে।

আবার তিনি দেশে না ফিরলে আওয়ামী লীগের সামনে বিকল্প নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।সুতরাং ডিসেম্বরের ঘটনা শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবেই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।

সবকিছু নির্ভর করবে তার প্রত্যাবর্তনের ধরন, সরকারের অবস্থান, আদালতের প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়ার ওপর।এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—শেখ হাসিনা কি সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরবেন?

আর যদি তিনি না ফেরেন, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—স্বেচ্ছায় ফেরার নতুন ঘোষণা, প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিদেশে অবস্থান—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তিনি ফিরুন বা না ফিরুন, তার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই ৩১ ডিসেম্বর কোনো আনুষ্ঠানিক ‘শেষ সময়সীমা’ না হলেও, ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক নজর এখন শেখ হাসিনার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে