×
ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রুমিন ফারহানার বাবার সাথে শেখ মুজিবের যা ঘটোছিল

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১৫:৩৯:৩৯
রুমিন ফারহানার বাবার সাথে শেখ মুজিবের যা ঘটোছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব তাদের সংগ্রাম, আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকেন। অলি আহাদ ছিলেন তেমনই একজন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এই রাজনীতিক নীতির প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।

তার একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ছোটবেলা থেকেই বাবার রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও নিপীড়নের নানা ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। ২০২২ সালে যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাবাকে স্মরণ করে রুমিন ফারহানা বলেছিলেন, ‘আমি বাবার একমাত্র সন্তান। আমি আমার বাবাকে যেদিন হারাই, সেদিন মনে হয়েছে আমি পৃথিবীর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি।’

অলি আহাদ ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৪৮ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন অলি আহাদ। একই বছর ১১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ভাষার দাবির আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাবরণ করতে হয়।

অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবনের বিস্তৃতি ছিল দীর্ঘ। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতাদের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি করেছেন।

শেখ মুজিব ও অলি আহাদের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে।ওই নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসনে তার বাবা অলি আহাদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘গাভী’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের তাহের উদ্দিন ঠাকুর। ভোটের মাঠে অলি আহাদ প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেলেও পরে ফলাফল পরিবর্তন করে তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর পেছনে শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল।

১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের পর তৎকালীন রাজনৈতিক মেরুকরণে তিনি মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অলি আহাদ সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরও গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি সোচ্চার ছিলেন।

পরবর্তীকালে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি বিভিন্ন সময়ে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় এবং একপর্যায়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের শরিক হয়।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। এরশাদ সরকারের সময়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অলি আহাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় তার লেখা ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫’ বইটি। এতে উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন উঠে এসেছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অলি আহাদ ছিলেন রুমিন ফারহানার বাবা। তার জীবনের রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি বাবার ব্যক্তিগত উপস্থিতিও রুমিনের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার পর ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মারা যান অলি আহাদ। স্ত্রী অধ্যাপক রশিদা বেগম ও একমাত্র সন্তান রুমিন ফারহানাকে রেখে তার মৃত্যু হয়।

ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের নানা পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর তার একমাত্র সন্তান রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক পরিচয়ের পেছনেও রয়েছে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ছাপ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে