×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এমপিদের নম্বর থেকেই আসছে টাকা চাওয়ার মেসেজ, নেপথ্যে যারা !

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১৮:৫০:৪০
এমপিদের নম্বর থেকেই আসছে টাকা চাওয়ার মেসেজ, নেপথ্যে যারা !

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় সংসদ সদস্যদের মোবাইল নম্বর ও পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংসদে সতর্ক করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। পরিচিত নম্বর থেকে ‘জরুরি ভিত্তিতে ৫০ হাজার টাকা পাঠান’, ‘৩০ হাজার টাকা পাঠান’ কিংবা ‘২৫ হাজার টাকা পাঠান’—এমন বার্তা পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, কয়েকজন সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিষয়টি শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে প্রচার করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

চিফ হুইপ বলেন, তিনি নিজেও এমন ঘটনার বিষয়ে কয়েকজন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। তাদের কাছে যে নম্বরগুলো থেকে টাকা চাওয়া হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের পরিচিত মোবাইল নম্বর। তিনি জানান, যাদের নম্বর থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। এ থেকে তিনি ধারণা করছেন, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর বা ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে পরিচিত কোনো ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির নম্বর থেকে বার্তা এলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার আগে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

এই প্রতারণার ধরন শুধু মোবাইল নম্বর হ্যাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতারকরা ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচিত কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের অনুরূপ কণ্ঠ তৈরি করে ফোনে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ফোনের অপর প্রান্তে পরিচিত ব্যক্তির মতো কণ্ঠস্বর শুনলেও সেটি প্রকৃত ব্যক্তির ফোন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি আরও জানান, কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র তৈরি করার ঘটনাও ঘটেছে। জাল স্বাক্ষরযুক্ত নথি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়া বা প্রতারণার চেষ্টা করা হলে এর প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে। তাই সংসদ সদস্যদের পরিচয়, স্বাক্ষর, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, সে বিষয়ে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

চিফ হুইপের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—এ ধরনের প্রতারণার শিকার শুধু সরকারি দলের সদস্যরা নন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও হয়েছেন। ফলে ঘটনাটিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি পরিচিত ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের সামাজিক মর্যাদা এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে ব্যবহার করে পরিচালিত একটি প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিষয়টি সংসদে উত্থাপনের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্যের নম্বর বা কণ্ঠস্বর ক্লোন করা কিংবা পরিচয় জাল করা হলে সেটির দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর চাপানো যায় না। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নির্বাহী বিভাগ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সতর্কতা নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

জবাবে চিফ হুইপ জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে মোবাইল নম্বরের অপব্যবহার ও এ ধরনের প্রতারণা কীভাবে ঠেকানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।

এদিকে সংসদ ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টিও একই বক্তব্যে সামনে আনেন চিফ হুইপ। তিনি জানান, সংসদ ভবনের বিভিন্ন লবিতে ফেস রিডিং বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ডিভাইস রয়েছে। সংসদ সদস্যদের সংসদ কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে এসব ডিভাইস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার মতে, পরিচয় নিশ্চিত করার এই ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভয়েস ক্লোনিং ও ডিজিটাল পরিচয় জালিয়াতির প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও বাড়ছে। আগে পরিচিত ব্যক্তির নম্বর থেকে ফোন বা মেসেজ এলে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হতো। কিন্তু এখন নম্বর বা কণ্ঠস্বর—দুটিই নকল বা অপব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় অতিরিক্ত যাচাই ছাড়া আর্থিক লেনদেন করা ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সাধারণ সাইবার নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, পরিচিত ব্যক্তি টাকা চাইলে অন্য কোনো নম্বরে ফোন করে পরিচয় নিশ্চিত করা, সরাসরি দেখা বা বিকল্প যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই করা এবং কোনো অবস্থাতেই OTP, PIN, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকিং তথ্য না দেওয়ার মতো সতর্কতা জরুরি। একইভাবে সন্দেহজনক মেসেজ বা ফোনকলের প্রমাণ সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, সংসদে চিফ হুইপের বক্তব্য একটি বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। জনপ্রতিনিধিদের পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ চাওয়া, ভয়েস ক্লোনের মাধ্যমে যোগাযোগ এবং স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ দেখাচ্ছে যে প্রতারণার কৌশল ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। ফলে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি মোবাইল অপারেটর, বিটিআরসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধরনের প্রতারণা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে