×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক খাতে ভয়াবহ সংকেত, আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১০:৩৫:৪০
ব্যাংক খাতে ভয়াবহ সংকেত, আর্থিক ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় তৈরি হওয়া সংকট এখন ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ দীর্ঘদিন ধরে আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপও বেড়েছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। ব্যাংক খাতে এত বড় প্রভিশন ঘাটতিকে আর্থিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, কোনো ব্যাংক তার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে লোকসান সামাল দেওয়া এবং মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পাঁচটি ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

বিশাল এই ঘাটতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়া এবং নতুন করে ঋণের মান খারাপ হওয়ার কারণে এসব ব্যাংকের ওপর প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ আরও বাড়ছে।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। তথ্য অনুযায়ী, ১০টি বেসরকারি ব্যাংকে সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি।

একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়।

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধিকে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।

ফলে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে আরও বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। কিন্তু অনেক ব্যাংকের আয় ও মুনাফা সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত না হওয়ায় প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে ঋণের মান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেলে সম্ভাব্য লোকসান মোকাবিলার জন্য ব্যাংককে আগে থেকেই অর্থ আলাদা করে রাখতে হয়। এর মাধ্যমে ঋণ আদায় না হলেও ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার একটি সুরক্ষা তৈরি হয়।

প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ব্যাংক খাতের সংকট নিয়ে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় উদ্বেগ হলো খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া। তাদের মতে, ঋণ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা এবং পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন সুবিধা যদি অতিরিক্ত দেওয়া হয়, তাহলে সময়মতো ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়েও খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না; খেলাপি ঋণের মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কমানো জরুরি।

বিশেষ করে যেসব ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত ও অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছানো ইতোমধ্যে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।এর সঙ্গে যদি বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি যুক্ত হয়, তাহলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন করে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বন্ধ এবং দুর্বল ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যাংক, ব্যবসা এবং সাধারণ আমানতকারী—সব পক্ষের ওপরই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে