×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরমাণু শক্তি নিয়ে বাংলাদেশে আসছে আমেরিকা, নেপথ্যে বড় খেলা!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১৮:৪৩:৪২
পরমাণু শক্তি নিয়ে বাংলাদেশে আসছে আমেরিকা, নেপথ্যে বড় খেলা!

নিজস্ব প্রতিবেদক : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি খাতে রাশিয়ার যে শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ নতুন এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিতে পারে। তবে বিষয়টিকে সরাসরি ‘রাশিয়াকে হটিয়ে আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে দেখার চেয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও কৌশলগত প্রভাবের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক।

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু রূপপুর। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ রুশ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান Rosatom প্রকল্পটির মূল প্রযুক্তি ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত।

রূপপুরের দুটি ইউনিটেই রুশ VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়—জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত নেওয়ার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়। ফলে রূপপুর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক অংশীদারিত্বের ভিত্তি।

বিশ্বের পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বড় আকারের প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি Small Modular Reactor বা SMR নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ব্যাপকভাবে কাজ করছে।

SMR-এর মূল আকর্ষণ হলো তুলনামূলক ছোট আকার, মডুলার নির্মাণ পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা। শিল্পাঞ্চল, ছোট গ্রিড কিংবা ভবিষ্যতের বিশেষায়িত বিদ্যুৎ চাহিদায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—SMR এখনো বাংলাদেশের জন্য বাস্তবায়িত কোনো মার্কিন প্রকল্প নয়। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও প্রযুক্তি, অর্থায়ন, নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত চুক্তি ছাড়া এটিকে মার্কিন পারমাণবিক প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।তাৎক্ষণিকভাবে নয়।

রূপপুরের প্রযুক্তি ইতোমধ্যে নির্ধারিত এবং প্রকল্পটি রুশ VVER প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। একটি চলমান VVER প্রকল্পের মধ্যে অন্য দেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি ঢোকানো বাস্তবিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল।তাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রবেশের আসল ক্ষেত্র হতে পারে রূপপুর-পরবর্তী বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচি।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে, তখন প্রশ্ন উঠবে—প্রযুক্তি কে দেবে, অর্থায়ন কে করবে, জ্বালানি কোথা থেকে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার থাকবে?

এই জায়গাতেই রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।রাশিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি সামনে আসে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়। রূপপুরের রুশ ঋণের কিস্তি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল না।

এখান থেকেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—কোনো একটি দেশের প্রযুক্তি ও অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বরং ভবিষ্যতের প্রকল্পে বিকল্প প্রযুক্তি, সরবরাহকারী ও অর্থায়নের সুযোগ রাখা বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে।এখানে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়, তাহলে এর মধ্যে পারমাণবিক নিরাপত্তা, অপ্রসারণ, নিয়ন্ত্রক কাঠামো, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ—সবই থাকতে পারে।

কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি বলা যে “আমেরিকা বাংলাদেশের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়”, সেটি প্রমাণিত তথ্য নয়। এমন দাবি করতে হলে নির্দিষ্ট চুক্তি, সরকারি নথি বা মার্কিন-বাংলাদেশি আলোচনার প্রমাণ প্রয়োজন।

বরং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ হলো—পারমাণবিক প্রযুক্তির সঙ্গে যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ, নিরাপত্তা মানদণ্ড, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত নির্ভরতা যুক্ত থাকে, তাই যে দেশ প্রযুক্তি সরবরাহ করে তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়; বরং কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ চাইলে—রূপপুরের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে; নতুন প্রকল্পে বিকল্প প্রযুক্তি ও সরবরাহকারী বিবেচনা করতে পারে; SMR প্রযুক্তির অর্থনৈতিক বাস্তবতা যাচাই করতে পারে; দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে;ব্যবহৃত জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় ও দায় স্পষ্ট করতে পারে; আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি আগে থেকেই হিসাব করতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাশিয়া বনাম আমেরিকা—এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে কার পক্ষে যেতে হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়।

মূল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কীভাবে এমন একটি পারমাণবিক শক্তি নীতি তৈরি করবে, যেখানে প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একক কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকবে না?

রূপপুরে রাশিয়ার ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ পারমাণবিক প্রকল্প, SMR বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে বিকল্প, দর-কষাকষির সুযোগ এবং নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।

সুতরাং ‘নেপথ্যে বড় খেলা’ থাকতেই পারে—কিন্তু সেই খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজেই, যদি ঢাকা তার পারমাণবিক নীতি জাতীয় স্বার্থ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে