×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুদের হার কমলেও ঋণে অনীহা ব্যবসায়ীদের, নেপথ্যে কী?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১৭:৪৯:৩৭
সুদের হার কমলেও ঋণে অনীহা ব্যবসায়ীদের, নেপথ্যে কী?

অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত ও ঋণের সুদের হার কমলেও তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে না। বরং ঋণের অনীহা এবং রেকর্ড পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য অর্থনীতিতে এক ধরণের মারাত্মক স্থবিরতার চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সুদের হার (পলিসি রেট) কমানোর নীতিতে হেঁটেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সুদের হারের ওপর অতিরিক্ত নিম্নমুখী চাপ তৈরি করছে। সব মিলিয়ে দেশ এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

সম্প্রতি ভালো অবস্থানে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণ উভয়ের ওপর সুদের হার ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। অথচ গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৪৭ শতাংশে যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকে আমানতের গড় সুদের হার ৭ থেকে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে, অন্যদিকে ঋণের সুদের হার ঘোরাফেরা করছে ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ ঢালছে, যার ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফার হার এক অঙ্কে নেমে এসেছে।

২০২৬ সালের জুন নাগাদ ব্যাংকিং খাতে মোট উদ্বৃত্ত তরল অর্থের পরিমাণ বার্ষিক ৩৯.৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৈদেশীক মুদ্রার বাজারেও একই ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানি চাহিদা দুর্বল থাকায় টাকার মান চড়া হচ্ছে। টাকার এই দর বৃদ্ধি ঠেকাতে এবং রপ্তানিকারক ও রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের সুরক্ষা দিতে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফের ডলার কেনা শুরু করেছে। সেদিন ১২২.৭৫ টাকা দরে ৫০ মিলিয়ন ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা খোলা বাজারে প্রচলিত রেমিট্যান্স রেটের (১২২.৩০–১২২.৬০ টাকা) চেয়ে বেশি। এর ফলে ৩ সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬.৩৩ বিলিয়ন ডলারে।

সুদের হার কমানোর এই প্রবণতা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থবির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্বের কারণে মারাত্মক ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সার্বিকভাবে এর ফলে অর্থনীতিতে 'স্ট্যাগফ্লেশন' বা স্থবিরতার সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যদিও আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৬ শতাংশে নেমেছে, তবুও এটি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশের চেয়ে বেশ উপরে।

এমন পরিস্থিতিতে সুদের হার কমিয়ে এবং প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং কাঠামোগত বাধা দূর না করে বাজারে শুধু টাকা ঢাললে মূল চাহিদা ফিরবে না, বরং মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে।

এদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে গত জুলাই মাসে পলিসি রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশে নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি ২০২২ সাল থেকে অনুসৃত কঠোর মুদ্রানীতির উল্টো পথ। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে পলিসি রেট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে এটি টানা প্রায় দুই বছর একই অবস্থায় রাখা হয়।

তবে সুদের হার কমলেও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়েনি। দেশের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক সিটি ব্যাংকের আমানত দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধিতে থাকলেও চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ, যা তাদের ঐতিহাসিক গড়ের অর্ধেকেরও কম।

ব্যাংকটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার পরও আশানুরূপ ঋণের চাহিদা তৈরি হয়নি। বড় করপোরেট গ্রাহকদের কম সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে উদ্বৃত্ত অর্থ ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা তহবিলে ২,০০০ কোটি টাকার বেশি জমা দিতে বাধ্য হয়েছে ব্যাংকটি।

জুন মাসের সরকারি তথ্যমতে বেসরকারি ঋণের ৪.৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, প্রকৃত প্রবৃদ্ধি মূলত ঋণাত্মক; প্রকাশিত এই অঙ্কের বড় অংশই হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ওপর ধার্য করা সুদ ও ফোর্সড লোন।

এমজে/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে