×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১৬:৩৭:১৩
১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি 

অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সংকটের জন্য দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সমানভাবে দায়ী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশেরও বেশি জমে আছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাঁধে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যার মধ্যে এই ১০টি সংকটাপন্ন ব্যাংকের দখলেই রয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতকে সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া এই ১০টি ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক।

খেলাপি ঋণের অঙ্কের দিক থেকে সব ব্যাংককে ছাড়িয়ে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮,৯১৪ কোটি টাকায়, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২.১৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। পরবর্তীতে ব্যাংকিং নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সহযোগীদের নামে তুলে নেয় গোষ্ঠীটি। গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুথানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের দখলমুক্ত হয় এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে পরিচালিত হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৯২,১১৫ কোটি টাকা, যা মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে আরও ৬,৭৯৯ কোটি টাকা বেড়েছে।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানান, তাদের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত এবং এটি উদ্ধারের গতি অত্যন্ত ধীর। তিনি বলেন, নগদ আদায় এবং পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে ঋণ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তবে কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। চলতি বছর ব্যাংকটি পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে ৫,৮৮৫ কোটি টাকা নিয়মিত করেছে এবং খেলাপিকৃত ঋণ থেকে ৭৪৯ কোটি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে।

ঋণ কেলেঙ্কারিতে জরাজীর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৫,৭২৯ কোটি টাকায়, যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৭৫ শতাংশ। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, খেলাপি ঋণের একটি বিশাল অংশ হাতে গোনা কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে আটকে আছে। বেক্সিমকো, এস আলম এবং অ্যাননটেক্সসহ শীর্ষ ২০ জন খেলাপির দখলেই রয়েছে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু বেক্সিমকো গ্রুপের কাছেই জনতা ব্যাংকের প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এছাড়া ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও থার্মেক্স গ্রুপও রয়েছে অন্যতম শীর্ষ খেলাপির তালিকায়। রাষ্ট্রায়ত্ত আরেকটি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের বোঝা ভারি হচ্ছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ পৌঁছেছে ৩২,১৩৩ কোটি টাকায়, যা বিতরণ করা ঋণের ৪৩.৯৮ শতাংশ।

ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্যান্য ব্যাংকগুলোর অবস্থাও মারাত্মক নাজুক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৬০,৬৪৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রিপোর্ট করেছে, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৯৭ শতাংশ। একই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯,৭গ৯ কোটি টাকা (৭৮ শতাংশ) এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭,১৩৪ কোটি টাকায় (৯৬ শতাংশ) গিয়ে ঠেকেছে।

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রভাবাধীন এক্সিম ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৮,০৫২.৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। ঋণ অনিয়ম এবং দুর্বল করপোরেট শাসনের কারণে ব্যাংকটিকে অন্য চারটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৮,৫২০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৬৩.৩৮ শতাংশ। এর বাইরে ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮,২৭৬ কোটি টাকা (৬৫.৪৬ শতাংশ) এবং এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০,৩২৫ কোটি টাকায় (৫৬.০৪ শতাংশ) পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান নজিরবিহীন খেলাপি ঋণ সংকট কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক মন্দা বা ব্যবসায়িক মন্দার ফল নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হওয়া অনিয়ম এবং ঋণ কেন্দ্রীভবনের এক ভয়াবহ প্রতিফলন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য স্পষ্ট করে দেয় যে, পুরো ব্যাংকিং খাতের সংকট সব ব্যাংকের কারণে তৈরি হয়নি। গুটিএক ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব ও অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনৈতিক আধিপত্যই আজকে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।

বিশেষ করে, এস আলম, বেক্সিমকোর মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় কর্পোরেট গ্রুপের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের সিংহভাগই (কিছু ক্ষেত্রে ৯৬ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত) খেলাপি হয়ে পড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিগত দিনগুলোর তদারকি ও নজরদারির চরম ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে।

এমজে/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে