×
ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতেই নতুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৬:১৫:৪৫
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতেই নতুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকার পর স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাজারটি খুলতে না খুলতেই দেশি-বিদেশি কয়েকটি চক্র এর বিরোধিতায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, শ্রমিক অভিবাসন ঠেকাতে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, বিবৃতি ও ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শ্রমবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশসহ মোট ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নেয় মালয়েশিয়া। দেশটির মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান পাঁচ কর্মী সরবরাহকারী দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশ থেকে ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি মালয়েশিয়া সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন না উঠলেও শুধু বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘চক্র’ শব্দ ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, বরং বাংলাদেশ সরকার শর্ত পূরণ করা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির পাশাপাশি ৩১২টি সহযোগী এজেন্সিসহ মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে, যা সব সোর্স কান্ট্রির মধ্যে সর্বোচ্চ।

একজন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক বলেন, জনসংখ্যা ও আয়তনে বিশাল দেশ ভারত থেকে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ে এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে না। অন্যান্য সোর্স কান্ট্রিও এ ধরনের অভিযোগ তুলছে না। তার মতে, বাংলাদেশই এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসে সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল—এমন প্রচারণা সঠিক নয়। তার দাবি, ওই সময় শুধু বাংলাদেশ নয়, মালয়েশিয়া সরকারের ‘ফরেন ওয়ার্কার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’-এর আওতায় ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকেই কর্মী নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশি কর্মীরা অধিকতর সুরক্ষা ও নিরাপদ ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ায় গেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

ওই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, আগের মেয়াদে ১০০টি লাইসেন্সের মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হলেও যেসব রিক্রুটিং লাইসেন্সধারীর কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা ছিল, তারা সবাই কাজের সুযোগ পেয়েছেন। মালয়েশিয়ায় শ্রমিকদের মজুরি মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশটিতে কর্মসংস্থানের চাহিদাও বেশি।

এদিকে বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়া ঠেকাতে বায়রার সাবেক এক নেতা ফখরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, বায়রার বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রিয়াজুল ইসলামকেও এ বিষয়ে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব বক্তব্যের কারণে তারা অতীতে হামলার শিকারও হয়েছেন।

একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, দেশের বেকারত্ব যখন বাড়ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেও মন্দাভাব চলছে, তখন নতুন সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রেমিট্যান্স বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের দাবি, ঠিক এই সময়ে ফখরুল-রিয়াজুল চক্র ওই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, সৌদি আরব, কাতার, ওমান এমনকি সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠাতে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অথচ এসব দেশের ন্যূনতম মজুরি মালয়েশিয়ার তুলনায় কম। তাদের প্রশ্ন, এসব শ্রমবাজার নিয়ে একই ধরনের আলোচনা বা সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলা হয় না কেন; শুধু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেই কেন এমন অভিযোগ সামনে আসে?

বায়রার কয়েকজন সদস্যের দাবি, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ নেপাল ও ভারতকে সুবিধা দিতে একটি চক্র বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, সরকার যখন বেকারত্ব কমানো এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স বাড়ানোর লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে, তখন ওই চক্র এর বিরোধিতা করছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের মধ্যে ফখরুল ইসলামের অতীত ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তাদের দাবি, আগের সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ‘১০ সিন্ডিকেটে’ তিনি অন্যতম সুবিধাভোগী ছিলেন। মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর ব্যবসার জন্য তার প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টারও সুবিধা পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

ব্যবসায়ীরা আরও দাবি করেন, ১০১ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় ফখরুল ইসলামের অন্তত দুটি লাইসেন্স ছিল। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টারের নাম ছিল।

তাদের অভিযোগ, ১০১ সিন্ডিকেটভুক্ত ফখরুল ইসলামের বেনামি প্রতিষ্ঠান ছিল ত্রিবেণী ইন্টারন্যাশনাল ও সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনাল। কাগজে অন্য ব্যক্তিদের মালিক দেখানো হলেও নেপথ্যে ফখরুল ইসলাম মালিক ও অংশীদার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য ব্যবসায়ীদের একটি করে লাইসেন্স থাকলেও তিনি দুটি লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যবসা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অন্যরা মূল ১০১ এজেন্সি, সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা শুধু মেডিক্যাল সেন্টারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ফখরুল ইসলাম এসব ক্ষেত্রেই সম্পৃক্ত ছিলেন। অথচ বর্তমানে তিনিই নিরাপদ শ্রমিক অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরূপ বক্তব্য দিচ্ছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

এদিকে চক্রটির আরেক সদস্য হিসেবে আফিফা ওভারসিজের মালিক আলতাফ খানের নামও উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, মালয়েশিয়ায় ‘কাউন্টার সেটিংয়ের’ মাধ্যমে অবৈধ মানবপাচারের অভিযোগে তিনি একসময় মালয়েশিয়ান দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হলে অবৈধ কর্মী পাঠানোর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই বিরোধিতা করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কম খরচে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। এসব দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত ছিল। ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।

মালয়েশিয়া সরকারের নির্ধারিত শর্ত পরিবর্তন করা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয়। তবে বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে দেশটির সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেছে। মালয়েশিয়ার আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে সরকার তার অন্যতম সাফল্য হিসেবে দেখছে।

সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্ট’-এ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।

বিমানভাড়াসহ কোনো ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মীর প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে। এই কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে